‘খাবারই মানুষকে শিকড়ের সঙ্গে বেঁধে রাখে’: যখন ‘বাড়ি’ আর থাকে না, তখন পারিবারিক রেসিপিগুলোর কী হয়?

রোকেয়া কালেকটিভ ডেস্ক
‘খাবারই মানুষকে শিকড়ের সঙ্গে বেঁধে রাখে’: যখন ‘বাড়ি’ আর থাকে না, তখন পারিবারিক রেসিপিগুলোর কী হয়?
হাওয়া হাসান ও তাঁর নতুন বই Setting a Place for Us সাক্ষাৎকার

আলি জামান যখন আফগানিস্তানের জাতীয় খাবার উজবেকি কাবুলি পোলাও রান্না করেন, তখন স্বাদ আরও গভীর করতে তিনি সবসময় সামান্য ভাজা তিলের তেল যোগ করেন। নিউইয়র্ক সিটির এই কফিশপ মালিকের শিকড় যেমন কুইন্সে, তেমনি আফগানিস্তানের কাবুল ও ময়মানাতেও। নিজের ঐতিহ্যের স্বাদ মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে তিনি ভীষণ আগ্রহী।

হাওয়া হাসানের নতুন বই Setting a Place for Us-এ তিনি বলেন, “বাড়ি শুধু মানচিত্রের একটি জায়গা নয়; এটি এমন এক অনুভূতি, যা সীমান্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।”

এই অনুভূতিই ছড়িয়ে আছে বইটির প্রতিটি পাতায়। জেমস বিয়ার্ড পুরস্কারজয়ী সোমালি-আমেরিকান শেফ ও লেখক হাওয়া হাসানের বইটি খাবার, পরিচয় এবং বাস্তুচ্যুতির গভীর সম্পর্ক তুলে ধরেছে।

তার আগের আলোচিত বই In Bibi's Kitchen-এর মতোই এই বইতেও ইতিহাস, ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা এবং ঐতিহ্যবাহী রান্নার রেসিপিকে একত্র করা হয়েছে। যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতিতে ক্ষতিগ্রস্ত আটটি দেশের—যেমন ইয়েমেন, এল সালভাদর, লেবানন, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোসহ—মানুষের গল্প ও খাবারের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে তাদের জীবনসংগ্রাম।

দুইবার নিজের বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া বাগদাদের এক ব্রুয়ারের হৃদয়স্পর্শী কাহিনি থেকে শুরু করে মিসরের সুস্বাদু ফিল ফিল মাহশি (স্টাফড ক্যাপসিকাম)-এর রেসিপি—সবই রয়েছে এই বইয়ে। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা নির্বাসনের কারণে মানুষ যখন সবকিছু পেছনে ফেলে চলে যেতে বাধ্য হয়, তখন তারা সঙ্গে করে কী গল্প ও কী স্বাদ বহন করে নিয়ে যায়—সেই কাহিনিই এখানে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বইটি অনুসন্ধান করেছে, কঠিন সময়ে খাবার কীভাবে মানুষকে নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে।

BBC Travel হাওয়া হাসানের সঙ্গে কথা বলেছে। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, কেন তিনি খাবারের মাধ্যমে প্রবাসী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে চেয়েছেন, সাক্ষাৎকার নেওয়া মানুষদের কাছ থেকে কী শিখেছেন এবং কেন অনেক সময় উপেক্ষিত সংস্কৃতিগুলোর জন্যও ‘খাবারের টেবিলে একটি আসন’ রাখা জরুরি।

প্রশ্ন: এখন পৃথিবীর অনেক জায়গায় মানুষ যুদ্ধ ও দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বইয়ের জন্য এই দেশগুলো কীভাবে বেছে নিলেন?

হাওয়া হাসান: আমি প্রায়ই বলি, নিজের গল্পটাও বুঝতে চেয়েছিলাম বলেই দেশগুলো বেছে নিয়েছি। তবে সত্যি বলতে, আমি নির্বাচন করেছি সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মানবিক সংকট এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের ভিত্তিতে।

এসব দেশ বহু সংকটের মধ্য দিয়ে গেলেও মানবসভ্যতার ইতিহাসে তাদের অবদান অসাধারণ। আমি ইরাককে সভ্যতার সূতিকাগার হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছি, লেবাননের বাণিজ্যিক ইতিহাস নিয়ে বলতে চেয়েছি, প্রাচীন মিসরের কথাও বলতে চেয়েছি।

কোনো দেশের কথা যখন শুধু যুদ্ধ বা বাস্তুচ্যুতির প্রেক্ষাপটে বলা হয়, তখন সেই দেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আড়ালে থেকে যায়। আমি সেই অসম্পূর্ণ ছবিটা বদলাতে চেয়েছি।

প্রশ্ন: প্রতিটি রেসিপির সঙ্গে একজন মানুষের ব্যক্তিগত গল্প রয়েছে। এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

হাওয়া হাসান: In Bibi's Kitchen-এও আমি একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছি। যখন কোনো রেসিপির সঙ্গে একজন মানুষের নাম ও মুখ জুড়ে দেওয়া হয়, তখন সেটি বাস্তব হয়ে ওঠে। গল্পটি প্রাণ পায়, স্পর্শ করা যায় এমন হয়ে ওঠে।

মানুষ আসলে মানুষের গল্প শুনতেই ভালোবাসে। আমার কাছে সবসময় মানুষই আগে, খাবার পরে। গল্পই প্রথম।

প্রশ্ন: মানুষ যখন তাদের গল্প ও রেসিপি ভাগ করে নিতে শুরু করলেন, তখন তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

হাওয়া হাসান: খুবই কোমল ও আন্তরিক। সেখানে ছিল হাসি, ছিল অশ্রু, আর ছিল নিজের সংস্কৃতি নিয়ে গভীর গর্ব।

প্রশ্ন: কেন মনে করেন, বিশেষ করে বাস্তুচ্যুতির সময়ে খাবার মানুষের পরিচয়ের এত শক্তিশালী অংশ হয়ে ওঠে?

হাওয়া হাসান: পরিবারের সঙ্গে ১৫ বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর আবার তাদের কাছে ফিরে আসি। তখনই খাবারের জগতে আমার আগ্রহ তৈরি হয়। আমি ভাবতে শুরু করি—নিজের অতীতের কত কিছুই না আমি ভুলে যেতে চেয়েছিলাম।

আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে পৌঁছাতে হলে নিজের শিকড়কে জানা জরুরি ছিল। অনেক সময় খাবারই আমাদের সেই শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আবার কখনও ভবিষ্যতের পথও দেখায়।

খাবার আমাদের সব ইন্দ্রিয়কে স্পর্শ করে। একটি গন্ধ মুহূর্তেই জীবনের অন্য এক সময়ে ফিরিয়ে নিতে পারে। একটি স্বাদ আমাদের অন্য এক জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে।

আর একটি বিষয় সবার জন্যই সত্য—আপনি যেখানেই থাকুন, আপনাকে খেতেই হবে।

আমি যখন এই বইটি লিখছিলাম, একজন আমাকে বলেছিলেন, “মানুষের মাথার ওপর যখন বোমা পড়ছে, তখন তারা খাবার নিয়ে ভাবে না।”

আমি তখন বলেছিলাম, “আসলে ঠিক উল্টোটা সত্যি। খাবারই মানুষকে মাটির সঙ্গে, নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে বেঁধে রাখে।”

প্রশ্ন: এই সময়ে অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতির গল্প বলা কেন জরুরি?

হাওয়া হাসান: কাউকে না কাউকে তো এসব নথিবদ্ধ করতেই হবে। শুধু একজন নয়, অনেক মানুষকে তাদের গল্প উচ্চস্বরে বলতে হবে, যাতে ক্ষমতাবানরা ভয় দেখিয়ে বা প্রান্তিক করে আমাদের কণ্ঠ থামিয়ে দিতে না পারে।

আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন আমাদের গল্প দরকার, গল্পকার দরকার, এমন মানুষ দরকার যারা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখবেন। আমাদের শেফ দরকার, ঘরের রাঁধুনি দরকার।

আপনি যদি কেবল এমন কিছু মানুষের জন্য রান্না করেন, যারা সমস্যার সমাধান খুঁজছেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

আমার মনে হয়, এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হলো সবাইকে সেই টেবিলে থাকা। আর নিজের বলার মতো গল্প না থাকলেও, অন্যদের গল্প মন দিয়ে শোনা।

প্রশ্ন: Setting a Place for Us পড়ে পাঠকেরা কী নিয়ে ফিরুক—এটাই আপনি চান?

হাওয়া হাসান: আমি চাই, মানুষ বুঝুক—প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েই মানুষ কীভাবে নিজেদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে।

তারা যেন উপলব্ধি করে, খাবার কখনোই শুধু খাবার নয়; এটি স্মৃতি, পরিচয় এবং টিকে থাকার প্রতীক।

এই বই কেবল রেসিপির সংকলন নয়। এটি এমন সব মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর, যাদের গল্প দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হয়েছে।

আমি চাই, পাঠকেরা এই খাবারগুলো রান্না করুন, অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিন, আর সেই সঙ্গে আমাদের সবার জন্য খাবারের টেবিলে একটি করে আসন রাখুন।

সূত্র : লিন ব্রাউনের নেওয়া হাওয়া হাসানের এই সাক্ষাৎকারটি বিবিসি প্রকাশ করেছে গতবছরের ১৯ মে। ইংরেজি থেকে অনুবাদিত ও সম্পাদিত।