শোনো মেয়ে, আজ তোমরা ঘর থেকে বের হতে পারতে না, যদি আমরা আন্দোলন না করতাম’— নূরজাহান বেগম

রুহিনা ফেরদৌস
শোনো মেয়ে, আজ তোমরা ঘর থেকে বের হতে পারতে না, যদি আমরা আন্দোলন না করতাম’— নূরজাহান বেগম
নূরজাহান বেগম

নূরজাহান বেগম (৪ জুন, ১৯২৫— ২৩ মে, ২০১৬)

১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই। কবি সুফিয়া কামালকে সম্পাদক করে সাপ্তাহিক ‘বেগম’-এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। উপমহাদেশে বাঙালি নারীদের প্রথম সচিত্র পত্রিকার শুরুটা এভাবে। কয়েক মাস পর সম্পাদনার দায়িত্ব নেন নূরজাহান বেগম।

৮ জুন, ২০১৫ সাল। ৯০ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের সাক্ষাৎকার নেওয়া শেষে বের হচ্ছি। পেছন থেকে বললেন, “শোনো মেয়ে, আজ তোমরা কেউ ঘর থেকে বের হতে পারতে না, যদি সে সময় আমরা আন্দোলন না করতাম। পত্রিকার মাধ্যমে লেখায়, ছবিতে এগিয়ে না যেতাম, তোমরা অবরোধে থাকতে।

আমরা অবরোধটা ভেঙেছি। এখন তোমাদের কাজ হলো এগিয়ে যাওয়া। যে যে মাধ্যমে চলতে পারো, সেভাবে এগিয়ে যাও।”

আজ (৪ জুন) নূরজাহান বেগমের জন্মদিন উপলক্ষে সেদিনের আলাপচারিতার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।

পুরান ঢাকার শরৎ গুপ্ত রোডের ৩৮ নম্বর বাড়ি। বাড়ির নাম মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন। ১৯৫০ সালে কলকাতা ছেড়ে সাংবাদিক ও ‘সওগাত’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ঢাকার এই বাড়িতে নিবাস গড়েন। এই বাড়িতেই থাকতেন নূরজাহান বেগম।

একে একে ১৪টি সিঁড়ি ভেঙ্গে, লম্বা বারান্দায় পৌঁছে চোখে পড়ে বাড়ির ভেতরের প্রশস্ত চারকোণা উঠোন। দোতলায় ছোট একটি খাটে পাশ ফিরে শুয়ে আছেন নূরজাহান বেগম।

“দ্যাখো, তুমি যা বলবে, প্রশ্নগুলো লিখে এনেছ তো? এখন একটানা কথা বলতে পারি না। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়”—বলতে বলতে উঠে বসলেন বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার এই অগ্রদূত।

খাটের পাশের ছোট টেবিলে রাখা কালোর রঙের টেলিফোনটি কিছুক্ষণ পর পর বেজে উঠছে। রিসিভার রেখে বললেন, “সারাদিন এই আমার কাজ। ওরা জানতে চায় লেখা ছাপা হবে কি না! যদি গল্প বেশি হয়ে যায়, তাহলে তো কবিতা দিবো। ওরা অফিসেও ফোন দেয়, আমার এখানেও দেয়।”

তিনি মূলত ‘বেগম’ পত্রিকার আসন্ন সংখ্যা নিয়ে তদারকি করছেন। ঠিক করে দিচ্ছেন এবারের সংখ্যায় কোন নারী লেখকের কী গল্প, কবিতা কিংবা কোন লেখাটা ছাপা হবে। সোফার একপাশে সারি করে রাখা বেশ কয়েকটি ফুলের তোড়া। ৪ জুন (২০১৫ সাল) ৯০ বছর বয়স ছুঁয়েছেন এই মহীয়সী—ফুলগুলো সে উদযাপনেরই অংশ।

নূরজাহান বেগমের জন্ম ১৯২৫ সালে চাঁদপুর জেলার চালিতাতলী গ্রামে। সাড়ে তিন বছর বয়সে বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের কাছে কলকাতায় চলে যান।

কলকাতার ১১ নম্বর ওয়েলেসলি স্ট্রিটের দোতলা বাড়িটি তখন ‘সওগাত’ পত্রিকার অফিস। ১৯১৮ সালে কলকাতা থেকে মাসিক ‘সওগাত’ পত্রিকা বের করেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। ‘সওগাত’ ছিল সাহিত্যচর্চা আর নতুন লেখকদের ঠিকানা। বিকেল হলে ভিড় করতেন লেখক-সাহিত্যিকরা। সে তালিকায় নাম আসবে কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী মোতাহার হোসেন, খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদসহ আরও অনেকের। শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতির সে আড্ডার অন্যতম শ্রোতা নূরজাহান।

বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সম্পর্কটা ছিল কাজের, বন্ধুত্বের। তাদের রাজনীতি আর দর্শনগত মিলও ছিল। বেগম রোকেয়াই মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে বলছিলেন, মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করা হয় নূরজাহান বেগমকে।

“বড় আনন্দ লাগে যখন ভাবি, এ অঞ্চলে নারী জাগরণের জন্য কিছু একটা করে যেতে পারলাম। আমরা যখন আরম্ভ করি, তখন কিন্তু এখনকার মতো এত সহজ ছিল না সবকিছু," বলেন নূরজাহান বেগম।

ছয় কিংবা সাত বছর বয়স থেকেই ‘সওগাত’ পত্রিকার নানা কাজের সঙ্গী তিনি। সে সময় হ্যান্ড কম্পোজ আর ব্লকে প্রিন্ট হতো। পড়াশোনার ফাঁকে কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা, ফাইলবন্দি করার টুকটাক কাজগুলোও করে দিতেন।

‘সওগাত’ যখন প্রথম ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সে সময় বেশ সমালোচনা শুরু হয় চারপাশে। স্মিত হেসে নূরজাহান বেগম বললেন, “‘একবার এক পীরসাহেব আব্বাকে চিঠির মাধ্যমে জানালেন, পত্রিকাটি পড়ে ভালো লাগল, কিন্তু ছবিটা না ছাপালে ভালো হয়।’ আব্বা উত্তরে লিখেছিলেন, ‘আপনি নামাজ পড়ার সময় বিদেশি সাহেবের ছবিযুক্ত কয়েন পকেটে রাখতে পারেন, তাহলে পত্রিকায় ছবি ছাপানো কী দোষের!’”

‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রথম যে নারীর লেখা ছাপা হয়, তা ছিল বেগম রোকেয়ার। এরপর দ্বিতীয় পাতায় যে লেখাটা ছাপা হয়, সেটি ছিল কবি মানকুমারী বসুর। তাতেও মেয়েদের সাহিত্যচর্চায় খুব একটা সম্পৃক্ত করা না গেলে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনসহ কয়েকজন মিলে ঠিক করলেন, পত্রিকায় মেয়েদের ছবিসহ লেখা ছাপতে হবে। ১৯৩০ সালে লেখার পাশাপাশি ছবি দিয়ে ‘সওগাত’এর মহিলা সংখ্যা প্রকাশ করা হয়। সেখানে কবি সুফিয়া কামালের প্রথম ছবিসহ লেখা ছাপা হয়।

১৯৪৬ সাল। রাজনৈতিক পালাবদল আর সংকটের ফলস্বরূপ দাঙ্গায় আক্রান্ত কলকাতা। এর মধ্যেই নারী প্রগতির নানা পরিকল্পনা করছেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। নূরজাহান বেগম বলেন, “কীভাবে নারীদের এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে ভাবতেন আব্বা। আমাদের বাড়ির কাছে পার্ক সার্কাসে থাকতেন কবি সুফিয়া কামাল। আব্বা তাকে ডেকে বললেন, নারীদের জন্য একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রয়োজন।”

সুফিয়া কামালকে সম্পাদক করে ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই সাপ্তাহিক ‘বেগম’-এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশ হয়। দেশভাগের কিছুদিন পর সুফিয়া কামাল ঢাকায় স্থায়ীভাবে চলে আসলে ‘বেগম’ সম্পাদনার দায়িত্ব বর্তায় নূরজাহান বেগমের কাঁধে। ১৯৪৮ সালে প্রথম নারী লেখিকদের ছবিসহ ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে সাপ্তাহিকটি।

নারী লেখকদের সংকট ছিল সে সময়। অনেক লেখা অনুবাদ করে নারীদের নামে ছাপা হয়েছে। শুধুমাত্র নারীদের লেখা নিয়ে তখন একটি সাপ্তাহিক বের করা সহজ ছিল না। তবুও শিশুস্বাস্থ্য, কৌতুক, জেনে রাখো, সুইট সিক্সটিন, ঘর সাজানোর মতো বিভাগ থাকতো ‘বেগম’-এ।

বইয়ের দোকানে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের ম্যাগাজিন, বই ঘেঁটে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে তা বাছাই করতেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। আর তা অনুবাদ করে ছাপানো হতো। “সে সময় আমাদের নিজেদের কোনো ছবিও ছিল না। ওই ইংরেজি বই থেকে পাওয়া ছবি দিতে হয়েছে। তখন আমাদের তো কিছুই ছিল না। বিদেশিদের ছবি, অন্যদের লেখা অনুবাদ করে এগোতে হয়েছে”—বলেন নূরজাহান বেগম।

কবি সুফিয়া কামালের পাশাপাশি ‘বেগম’-এ তখন লেখক হিসেবে যুক্ত হন শামসুন নাহার মাহমুদ, হামিদা খানম, কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, সাঈদা খানম, লায়লা সামাদ, জাহানারা আরজুসহ আরও অনেকে।

১৯৫০ সালে ঢাকার বিজয়া প্রেসের সঙ্গে কলকাতার সওগাত প্রেস বদল করে ঢাকায় চলে আসেন তারা। টিনের ঘর, ব্লক নেই—সব ঘর টিনে ঘেরা এমন জবুথবু পরিস্থিতি সামলে ধীরলয়ে কাজ শুরু করতে হয় আবার। কারও ঠিকানা জানা ছিল না, তেমন করে নারী লেখিকাদেরও চিনতেন না। তবুও সে বছর ৬৬ নম্বর পাটুয়াটুলীর ‘বেগম’ কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হতে থাকে পত্রিকাটি।

১৯৫৪ সালে আমেরিকা থেকে সাংবাদিক মিসেস আইডা আলসেথ ‘বেগম’ কার্যালয় পরিদর্শনে আসেন। ভাঙাচোরা অফিসে তাকে কোনোভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়। তখন ‘বেগম’ প্রকাশ হতো ক্রাউন সাইজে। পত্রিকা দেখে মুগ্ধ হয়ে আইডা নূরজাহান বেগমকে প্রশ্ন করেন, “এত লেখা প্রতিটি পাতায়। কেন তুমি ছবিতে যাও না? পত্রিকায় ছবি কথা বলবে।”

উত্তরে নূরজাহান বেগম বলেছিলেন, “এখানে তো নারী লেখিকাদের সঙ্গে যোগাযোগটা কম।” আইডা তাকে পরামর্শ দেন মেয়েদের নিয়ে একটি ক্লাব গঠনের। ১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেগম ক্লাব’।

‘বেগম’-এর হাত ধরে অসংখ্য নারী লেখক তৈরি হয়েছে, লেখালেখিতে যুক্ত হয়েছেন অনেকে—বলেন নূরজাহান বেগম। আরো জানান, বেগম এখন আর সাপ্তাহিক নয়, মাসিক পত্রিকা হিসেবে বের হয়। পত্রিকাটির সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন তার বড় মেয়ে ফ্লোরা নাসরীন খান। প্রুফ দেখার কাজ করেন একজন, আর লেখকদের ফোন করে লেখা আনার কাজটি করেন নূরজাহান বেগম। কারা প্রবন্ধ লিখবে, কারা ছোট গল্প—এসব এখনো তিনিই ঠিক করে দেন। বললেন, “এখন মেয়েরা অনেক ভালো লিখছে।”

যেভাবে আছে, যতটুকু আছে—নতুন লেখিকা তৈরির জন্য ‘বেগম’ যেন বেঁচে থাকে, এটাই তার একমাত্র ইচ্ছা। ‘নারীরা জাগো’—এই আদর্শকে সামনে রেখে প্রকাশিত হয় ‘বেগম’।

নোট: মূল লেখাটি ২০১৫ সালে দৈনিক বণিক বার্তার সিল্করুটে প্রকাশিত হয়। আজ নূরজাহান বেগমের জন্মদিন উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হলো।