রইদ: যে নারী প্রতীকের বাইরে

নাজিয়া আফরিন
রইদ: যে নারী প্রতীকের বাইরে
roid

ফেসবুকে একটা মিম দেখছিলাম।’রইদ’ দেখতে যাওয়ার আগে কোন কোচিং করলে ভালো হবে - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না বুয়েট! মেজবাউর রহমানের দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে সাধারণ দর্শকের গড় প্রতিক্রিয়ারই প্রতিফলন এই ব্যাঙ্গাত্মক মিম। কারণ হলে টিকিট কেটে সিনেমা দেখতে আসা দর্শকদের সামষ্টিক অবচেতনে চলচ্চিত্রিক আখ্যানের যে আদি রূপ গাঁথা আছে সেটাকে প্রবলভাবে আঘাত করেন সুমন।

আর যা করেন তা হলো, দশকের পর দশক বাংলাদেশের সিনেমার পর্দায় নারীর যে প্রতিমা আমরা দেখতে পাই - সুন্দরী, বাধ্য, রান্নাঘরের সুঘ্রান মাখা, সন্তানের জন্য উদগ্রীব, পুরুষের দৃষ্টির জন্য অলঙ্কৃত; সেটাকে ভেঙে চুরমার করে দেন - নিঃশব্দে, নির্মমভাবে, এবং সম্পূর্ণ নতুন এক ভাষায়।

পাহাড় আর জলাশয় ঘেরা এক জনগোষ্ঠীর কোন এক কোণে এক নিঃসঙ্গ মাঝবয়সী ভৃত্য সাধু অবশেষে জীবনসঙ্গী হিসেবে পান এক কমবয়সী তরুণীকে। এই বিষয়টি সকলেই বেশ জোর দিয়ে বলে, কম বয়সী মেয়েটি দেখতে বেশ ভালো, তবে মাথায় একটু ছিট আছে। এই সরল আখ্যানের গভীরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য ও চলচ্চিত্রে নারীর যে চিরাচরিত প্রতিমূর্তি, তার থেকে আমূল বিচ্ছেদ এবং সেই বিচ্ছেদই “রইদ”কে অসাধারণ করে তোলে।

বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্রে নারী চরিত্র প্রায় সবসময়ই একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢালা। সে সুন্দরী, সুগৃহিণী, মাতৃহৃদয়া, বাধ্য এবং সর্বোপরি - নামযুক্ত, পরিচিত, সমাজব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। এই নারীর অস্তিত্ব সংসারের ভেতরে, পুরুষের চাহিদার আয়নায় প্রতিফলিত। সে কামনার বস্তু, প্রেমিকা, বোন, মা - কিন্তু কখনো নিজে সম্পূর্ণ সত্তা নয়।

রইদের নামহীন স্ত্রী এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যকে সরাসরি অস্বীকার করেন। এই সিনেমায় ছাগলের নাম আছে, গাই গরুর নাম আছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রের কোনো নাম নেই। এটি নিছক গল্পের খামতি নয়, এটি একটি সচেতন আদর্শগত অবস্থান।

ফরাসি মনোবিজ্ঞানী ও সাইকোঅ্যানালিস্ট জাঁক লাকাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি শিশু জন্মের পর প্রথমে থাকে 'ইমাজিনারি' বা কল্পনার জগতে - মা ও শিশুর একটি অবিভাজ্য, ভাষাহীন সম্পর্কে। কিন্তু এই সম্পর্কে একদিন প্রবেশ করে তৃতীয় একটি সত্তা - পিতা। পিতা শুধু একজন জৈবিক মানুষ নন, তিনি সমাজের সমগ্র নিয়মকানুন, আইন, ভাষা এবং ক্ষমতার কাঠামোর প্রতীক।

লাকাঁ এই সত্তাকে বলেন 'নেম অব দ্য ফাদার' বা 'পিতার নাম'। এই 'পিতার নাম'-ই শিশুকে ইমাজিনারির মুক্ত, অনিয়ন্ত্রিত জগৎ থেকে টেনে বের করে 'সিম্বলিক অর্ডার' বা প্রতীকী ব্যবস্থায় প্রবেশ করায়। সিম্বলিক অর্ডারে প্রবেশ মানেই ভাষা শেখা, নিয়ম মানা, নিজের একটি নির্দিষ্ট পরিচয় গ্রহণ করা। এবং সেই পরিচয়ের প্রাথমিক চিহ্ন হলো নাম। নামের মাধ্যমেই একজন মানুষ সমাজের চোখে 'অস্তিত্বশীল' হয়, সে পরিবারের অন্তর্গত হয়, রাষ্ট্রের খাতায় নথিভুক্ত হয়, সমাজের প্রত্যাশার জালে আটকা পড়ে।

রইদের নারী এই জালে আটকা পড়েননি। তাঁর কোনো পিতার নাম নেই, কোনো সামাজিক ভূমিকা তেনেই। তিনি সেই 'রিয়েল' বা 'প্রকৃত'- তে বিচরণ করেন, যা সিম্বলিক অর্ডারের বাইরে। যেখানে ভাষা পৌঁছায় না, সমাজের নিয়ন্ত্রণ কাজ করে না। তাঁর 'পাগলামি' আসলে এই রিয়েলের প্রকাশ। সমাজ যা ধারণ করতে পারে না, তাকেই সে 'উন্মাদনা' বলে চিহ্নিত করে। এই অর্থে তাঁর নামহীনতা দুর্বলতা নয়, এটিই তাঁর সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ।

সমাজ, সংসারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা বা না চাওয়া স্ত্রীকে বস্তায় ভরে বিড়াল ফেলে রেখে আসার মতোই ঘর থেকে বহু দূরে ফেলে রেখে আসে সাধু। নাম-ঠিকানা মনে না রাখতে পারলেও পাগলী বার বার ফিরে আসে। ছেঁড়া-ফাটা পোশাক, জট বাঁধা চুল, দীর্ঘ পথ চলার চিহ্ন চোখে-মুখে, তবু জীবনের আনন্দে ভরপুর। সৌন্দর্যহীন, সংসারের বাইরে থাকা এক নারী এই আখ্যানের কেন্দ্রে। তাঁর অস্তিত্বই গল্পটিকে চালিত করে।

এখানেই লরা মালভির 'মেল গেজ' বা পুরুষদৃষ্টির তত্ত্বটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। মালভি তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “ভিজ্যুয়াল প্লেজার অ্যান্ড ন্যারেটিভ সিনেমা”তে দেখিয়েছেন যে চলচ্চিত্রের ক্যামেরা মূলত পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজ করে। নারীকে দেখানো হয় দর্শকের ভোগের জন্য: তাকে খণ্ডিত করা হয়, যৌনায়িত করা হয়, এবং পুরুষ চরিত্রের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়। এই কাঠামোয় নারী সক্রিয় নয়, সে দেখার বস্তু - 'টু-বি-লুকড-অ্যাট-নেস' তার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র এই মেল গেজকে সযত্নে লালন করেছে - নায়িকার সৌন্দর্য প্রদর্শন, তার শরীরের দিকে ক্যামেরার বিশেষ মনোযোগ, এবং তার অস্তিত্বকে নায়কের চাহিদার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নির্মাণ - এই সবই সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ।

“রইদ” এই মেল গেজকে সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। সাধুর স্ত্রী পুরুষের দৃষ্টির জন্য নির্মিত নন। তাঁকে কামনার বস্তু হিসেবে ফ্রেম করা হয় না, তাঁর শরীরকে ক্যামেরা খণ্ডিত করে না। বরং তিনি নিজেই দেখেন - প্রকৃতিকে, আকাশকে, মাটিকে এবং সেই দেখার মধ্যে পুরুষের অনুমোদনের কোনো প্রয়োজন নেই।

এই চলচ্চিত্রে ক্যামেরার দৃষ্টি পুরুষতান্ত্রিক নয়। ফলে সাধু সেই 'ক্যাস্ট্রেটেড মেল'-এ পরিণত হয়, লাকাঁর মতে যে পুরুষ প্রতীকী ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে তার 'ফ্যালিক' ক্ষমতার দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না। মালভির কাঠামোয় বলতে গেলে, সাধু সেই দর্শকের অবস্থানে থাকতে চায় যে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করে, দেখে, সংজ্ঞায়িত করে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী তাকে সেই ক্ষমতা দেন না। সে বারবার তাঁকে দূরে ফেলে আসে, কিন্তু যতবার তাল গাছ থেকে ফল পড়ে, ততবারই তিনি ফিরে আসেন। সাধুর নিয়ন্ত্রণ কাল্পনিক এবং সেই মিথ্যা নিয়ন্ত্রণই তার খোজাত্বের প্রকৃত স্বরূপ।

পরিচালক সুমন নিজেই স্বীকার করেছেন যে সাধু আর পাগলীর প্রেমকাহিনী মানবজাতির সবচেয়ে পুরনো আখ্যান - আদম-হাওয়ার কাহিনীর আধুনিক প্রতিধ্বনি। কিন্তু এই নারী হাওয়া নন, তিনি লিলিথ। ইহুদি পৌরাণিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, আদমের প্রথম স্ত্রী লিলিথ আদমের অধীনতা মানতে অস্বীকার করেছিলেন, স্বর্গ ছেড়ে বনে চলে গিয়েছিলেন। তিনি সুন্দরী ছিলেন না, বাধ্য ছিলেন না, কিন্তু স্বাধীন ছিলেন। রইদের নামহীন স্ত্রী ঠিক সেই লিলিথ। সমাজের পুরুষতান্ত্রিক প্রতীকী ব্যবস্থা তাঁকে বশে আনতে পারে না, তাই তাঁকে 'পাগলী' তকমা দিয়ে প্রান্তিক করা হয়।

চলচ্চিত্রটির দৃশ্যগত ও আবেগীয় গভীরতা চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের গ্রামীণ বাংলার রূপায়ণ থেকে ঋণী। সুলতানের শিল্পেও নারী শরীর ছিল মাটির মতো - সমাজের সংজ্ঞার বাইরে, প্রকৃতির কাছাকাছি। সেই ঐতিহ্যের সাথে “রইদ’-এর এই সংযোগ অনিচ্ছাকৃত মনে হয় না।

“রইদ” বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একটি সাহসী ভাষ্য। এটি প্রমাণ করে যে গল্প বলার পুরনো ছাঁচ ভাঙা সম্ভব - নারীকে সংসারের বাইরে, প্রতীকের বাইরে, নামের বাইরে রেখেও গভীর চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব।