“পুরুষ মানুষ এমনই” - চলচ্চিত্রে যেভাবে উদযাপিত হয় পুরুষের পরকীয়া

নাজিয়া আফরিন
“পুরুষ মানুষ এমনই” - চলচ্চিত্রে যেভাবে উদযাপিত হয় পুরুষের পরকীয়া
ছবি: ইন্টারনেট

আপনি কতবার এমন কোনো বাংলা বা হিন্দি সিনেমা দেখেছেন যেখানে একজন পুরুষ পরকীয়া করছে কিংবা স্ত্রী/প্রেমিকাকে লুকিয়ে অন্য মেয়ের সঙ্গে খুনসুটি করছে আর পর্দায় তা দেখে দর্শক হেসে গড়িয়ে পড়ছে! কখনো কি এমনটা দেখেছেন যে, একজন নারী পর্দায় একই কাজ করছেন আর দর্শক হাসছে? তখন দর্শকের মনে অস্বস্তি, চোখে ঘৃণা আর কাঁধে নেমে আসে বিচারের ভার। ফলে অবধারিতভাবেই শেষ দৃশ্যে সেই নারীর জন্য অপেক্ষা করে শাস্তি। এই দুটো প্রতিক্রিয়ার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, সেটাই আমাদের সমাজের স্বরূপ।

এক নায়ক আর একাধিক (কখনো দুইয়ের অধিক) নায়িকা নিয়ে বলিউডের বেশ একটা ঘোর কাজ করে। সেই ১৯৭৮ সালে পরনারীর প্রতি বিবাহিত পুরুষের অমোঘ আকর্ষণকে উপজীব্য করে তৈরি হয়েছিল হিন্দি সিনেমা ‘পতি, পত্নী অউর ওহ’, সেই সিনেমা রিমেক হলো ২০১৯ সালে একই নামে এক নায়ক আর দুই নায়িকা নিয়ে। এবার আসছে ‘পতি, পত্নী অউর দো’ অর্থাৎ নায়ক এক, নায়িকা তিন। পুরুষের বিশ্বাসঘাতকতা এ অঞ্চলের চলচ্চিত্রিক বয়ানে যুগ যুগ ধরে এমনভাবে দেখানো হচ্ছে যেন এটা শুধু স্বাভাবিকই নয়, উপভোগ্য! একজন পুরুষ দুটো মেয়েকে একসঙ্গে ‘নাচাচ্ছে’, এটা যেন বেশ একটা কৃতিত্বের ব্যাপার। অনেক সময় হাসি-তামাশার ছলে বিষয়টিকে মহিমান্বিতও করা হয়। গল্পের শেষে সাধারণত পুরুষটি কিছুটা অনুতপ্ত হন, স্ত্রী এবং প্রেমিকা উভয়ই তাকে ক্ষমা করে দেন আর এরপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকে। আর এই প্রতারণার কোনো প্রকৃত পরিণতি থাকে না, কোনো নৈতিক মূল্য চুকাতে হয় না।

এই মানসিকতা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর শেকড় অনেক গভীরে। আমাদের ধ্রুপদী বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের দিকে তাকান। জমিদার বাবু কিংবা নবাব সাহেব মানেই একাধিক রক্ষিতা, একাধিক সম্পর্ক। এটা তার দুর্বলতা নয়, ক্ষমতার প্রতীক। বিশাল প্রাসাদ, সম্পত্তি আর অগণিত নারী - এই তিনটে মিলিয়েই ছায়াছবির পরাক্রমশালী ‘পুরুষমানুষ’। পর্দায় এই সামন্তবাদী পুরুষটি যখন নিজ শ্রেণীর বাইরে কোনো নারীর ‘দখল’ পেতে চান, তখন গল্পটা হয়ে ওঠে ‘প্রেমের গল্প’। সেই একই কাজ একজন নারী করলে? সেটা তখন হয়ে যায় নৈতিক বিচ্যুতি আর সামাজিক অবক্ষয়ের কাহিনি।

আধুনিক চলচ্চিত্রে জমিদার বা নবাবের জায়গায় এসেছে শহুরে ব্যবসায়ী বা কর্পোরেট চাকুরে পুরুষ। তবে তার জন্য নৈতিক মানদণ্ড ঠিক আগের মতোই আছে। চলচ্চিত্রিক আখ্যানে পুরুষের একাধিক সম্পর্ক বা একাধিক নারীর প্রতি আসক্তি এখনো ‘স্বাভাবিক’, আর নারীর ক্ষেত্রে এখনো ‘অগ্রহণযোগ্য’।

অপর্ণা সেন ১৯৮৫ সালে নির্মাণ করেন ‘পরমা’ সিনেমাটি। চৌধুরী বাড়ির লক্ষ্মী বউ, যে কারো মা, কারো কাকিমা, কারো বৌদি। শুধু তার নিজের পরিচয়টিই পুরোনো ফেলে রাখা জিনিসের মতো কোথাও পড়ে আছে অবহেলায়। তার আত্মঅন্বেষণ ও যৌন স্বায়ত্তশাসন খোঁজার চেষ্টাকেই নির্মাতা অপরাধ হিসেবে দেখাননি। কিন্তু সমাজ তাকে ছেড়ে কথা বলে না। পরিবার, পাড়া, প্রতিবেশী - তার পরকীয়াকে কোনোভাবেই মেনে নেয় না। চলচ্চিত্রের শেষে তাই ক্ষমা নয়, পরমার কপালে জোটে নিরেট নিঃসঙ্গতা।

হালের ‘ককটেল’ সিনেমাটির কথা ধরুন। এই সিনেমাতেও এক নায়কের বিপরীতে দুই নায়িকা। তবে সিনেমার ভেরোনিকা চরিত্রটি স্বাধীনচেতা, নিজের শর্তে বাঁচে, একজন পুরুষের মতোই নিজের যৌনতার এজেন্সি তার নিজের হাতেই। কিন্তু সিনেমার শেষে নায়ক বেছে নেয় ‘ভালো মেয়ে’ মীরাকে। ভেরোনিকা নিজেকে পাল্টে ফেলে ‘ভালো মেয়ে’ হওয়ারও চেষ্টা করে। কিন্তু বিচ্যুতির শাস্তি তো পেতেই হবে।

কিন্তু নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পাল্লা নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে সমান নয় কেন! কারণ আমরা ছোটবেলা থেকে শিখি নারীই সম্পর্ক রক্ষা করবে, সামাজিক মর্যাদাকে সমুন্নত রাখবে, পবিত্রতার প্রতীক হয়ে থাকবে। যখন সে এই ছাঁচ ভাঙে, তখন সমাজ সেটাকে ক্ষমা করতে পারে না।

নারীর রাজনৈতিক অধিকার, কর্মক্ষেত্রে সমতা, শিক্ষার সুযোগ - এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কথা বলেই চলেছি। কিন্তু নারীর শরীর, তার কামনা, তার যৌন স্বাধীনতা - এই প্রসঙ্গগুলো এলেই সবাই চুপ হয়ে যায়। কারণ ‘সামাজিক শালীনতার’ জোয়াল কেবল নারীর কাঁধেই চাপানো রয়েছে আর হাজার বছর ধরে নারী তা টেনে চলেছে।

বলা হয় চলচ্চিত্র সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়, তবে একই সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতাকে আকারও দেয়। পুরুষের প্রতারণাকে যখন বারবার কমেডি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন মানুষ সেটাকে আরও স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শেখে। আর নারীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা যখন বারবার শাস্তিতে পরিণতি পায়, তখন মেয়েরা শেখে - স্বাধীন হওয়ার মূল্য অনেক বেশি। এই গল্প বলার ধরনটা পাল্টাতে হবে, নতুবা পরমা, ভেরোনিকারা পর্দায় একাই দাঁড়িয়ে থাকবে।