ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার প্রতিটি গোলে একেকটি স্কুলে মাসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে শুরু হয় এক ভিন্ন উন্মাদনা। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে ঘিরে রাতজাগা খেলা, পতাকা, জার্সি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক, এমনকি অনেক সময় সংঘর্ষও। সেই উন্মাদনাকেই এবার সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিতে রূপ দিতে চায় ওয়াটারএইড বাংলাদেশ।
সংস্থাটি গোল ফর গুড (Goal4Good) বা ভালোর জন্য গোল ক্যাম্পেইন নামে একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা যতগুলো গোল করবে, ততটি প্রান্তিক ও তুলনামূলক অধিকারবঞ্চিত মেয়েদের স্কুলে স্থাপন করা হবে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস কোঅর্ডিনেটর প্লাবন গঙ্গোপাধ্যায় রোকেয়া কালেকটিভকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন নয়; বরং মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনপরিসরে ইতিবাচক আলোচনা তৈরি করা এবং যেসব স্কুলে মেয়েদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই, সেখানে নিরাপদ ও সম্মানজনক মাসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
প্লাবন গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে ঘিরে তুমুল উন্মাদনা। অনেক সময় এই উন্মাদনা তর্ক-বিতর্ক বা সংঘাতেও রূপ নেয়। আমরা ভাবলাম, এই আবেগকে যদি একটি ভালো কাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে সেটি আরও অর্থবহ হবে।”
প্লাবন জানান, বাংলাদেশে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি সমর্থক ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার। তাই এই দুই দলকে কেন্দ্র করেই ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
“আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই দুই দল যত গোল করবে, ততটি প্রান্তিক স্কুলে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বসাব। ধরুন, দুই দল মিলিয়ে ২২টি গোল করলে আমরা ২২টি স্কুলে এই সুবিধা পৌঁছে দেব,” বলেন তিনি।
তবে কেন পুরো বিশ্বকাপে হওয়া সব গোলের পরিবর্তে শুধু ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার গোল ধরা হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে প্লাবন বলেন, এর পেছনে বাস্তব কারণ রয়েছে।
“আমরা চাই মানসম্পন্ন ভেন্ডিং মেশিন দিতে। শুধু সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নিম্নমানের কিছু বসাতে চাইনি। আমাদের আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতার মধ্যেই আমরা কাজ করছি।”
তবে তিনি জানান, অন্য সরকারি, বেসরকারি কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এই উদ্যোগে অংশীদার হলে আরও বেশি স্কুলে এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
“এখন এক গোলের বিপরীতে একটি স্কুলে মেশিন দিচ্ছি। আরও সহযোগী পেলে একই গোলের বিপরীতে দুই বা তিনটি স্কুলেও এই সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। আমরা চাই সংখ্যাটা বাড়ুক।”
কেন প্রয়োজন এমন উদ্যোগ
প্লাবনের মতে, নিম্ন আয়ের পরিবারের অনেক মেয়েই এমন স্কুলে পড়ে, যেখানে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় সুযোগ নেই। শহরের তুলনায় প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক এলাকার স্কুলগুলোতে এই সংকট আরও প্রকট।
তিনি বলেন, “আমরা চাই মানুষ বুঝুক, এটি কোনো বিলাসিতা নয়। একটি মেয়ের স্কুলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে মাসিক সামলানোর সুযোগ তার মৌলিক প্রয়োজন।”
২০২৫ সালে ইউনিসেফ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ স্কুলছাত্রী মাসিকের কারণে প্রতি মাসে গড়ে আড়াই (২.৫) দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। কুসংস্কার, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন জায়গার অভাব এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় তারা নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকতে পারে না। এর ফলে তাদের শেখা, বেড়ে ওঠা এবং বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
ইউনিসেফের মনে করে, স্কুলগুলোতে জেন্ডার-সংবেদনশীল পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH) সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে মেয়েদের স্কুলে অনুপস্থিতির হার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে এবং শিশুদের পানিবাহিত রোগও প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে আসে।
মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনও বড় বৈষম্য
বাংলাদেশে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় বাড়লেও প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবহার ও সহজপ্রাপ্যতার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে রাজধানীতে আয়োজিত ‘নিরাপদ মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এক আলোচনায় স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্র্যান্ড সেনোরা এবং প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) জানায়, দেশে মাত্র ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী ও কিশোরী মাসিকের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৮৩ জন এখনও এই স্বাস্থ্যসুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করেন না।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্কয়ার টয়লেট্রিজের বিপণন বিভাগের প্রধান জেসমিন জামান। তিনি বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, মাসিকের সময় তুলা, অপরিষ্কার কাপড় কিংবা অনুপযুক্ত উপকরণ ব্যবহারের কারণে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য নানা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, মাসিকের সময় গড়ে তিন দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে প্রায় ৪০ শতাংশ স্কুলছাত্রী। একইভাবে পোশাকশিল্পে কর্মরত প্রায় ৬০ লাখ নারী শ্রমিক মাসিকের কারণে গড়ে ছয় দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিরাপদ মাসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে অনেক নারী নিয়মিত ন্যাপকিন কিনতে পারেন না। তাঁদের মতে, এই পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা প্রয়োজন।
ভেন্ডিং মেশিন কেন গুরুত্বপূর্ণ
ওয়াটারএইডের গোল ফর গুড (Goal4Good) ক্যাম্পেইনের অন্যতম উপকরণ হচ্ছে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন।
ইউনিসেফও বাংলাদেশে একই ধরনের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের সহায়তায় দেশের কয়েকটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ইতোমধ্যে স্যানিটারি প্যাড ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করা হয়েছে, যাতে রোগী, পরিচর্যাকারী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রয়োজনের সময় সহজে স্যানিটারি প্যাড সংগ্রহ করতে পারেন।
এ ছাড়া স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হাইজিন কর্নার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেল টয়লেট নির্মাণেও সরকারের সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ। এসব টয়লেটে নিরাপদে ব্যবহৃত স্যানিটারি সামগ্রী ফেলার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে মেয়েরা মর্যাদার সঙ্গে মাসিক ব্যবস্থাপনা করতে পারে।
মানুষের সাড়া প্রত্যাশার চেয়েও বেশি
গোল ফর গুড (Goal4Good) ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে প্রতিটি ম্যাচ শেষে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার গোলসংখ্যা প্রকাশ করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে আহ্বান জানানো হচ্ছে, তারা যেন এমন স্কুলের নাম জানান, যেখানে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
প্লাবন গঙ্গোপাধ্যায় জানান, এই উদ্যোগে মানুষের সাড়া তাঁদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।
“আমরা ভেবেছিলাম মানুষ হয়তো কিছু স্কুলের নাম জানাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ৫০০টিরও বেশি স্কুলের সুপারিশ এসেছে,” বলেন তিনি।
তাঁর মতে, সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এসব সুপারিশের একটি বড় অংশ এসেছে পুরুষদের কাছ থেকে।
“এটি আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক একটি বিষয়। কারণ এটি দেখায়, সঠিক সময়ে সঠিক বিষয় সামনে আনতে পারলে মানুষ দায়িত্বশীল আচরণ করতে চায়।”
প্লাবন বলেন, এই ক্যাম্পেইনের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে উপলব্ধি করানো যে, স্কুলে মাসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়।
“আমরা চাই মানুষ নিজেরাই বলুক কোন স্কুলে এই সুবিধা প্রয়োজন। মানুষ যেন এটিকে বিলাসিতা নয়, বরং একটি প্রয়োজন হিসেবে দেখে,” বলেন তিনি।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি স্কুলের সুপারিশ এসেছে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন প্রান্তিক স্কুলের জন্য।
কীভাবে বাছাই হবে স্কুল
যদিও ইতোমধ্যে ৫০০টিরও বেশি স্কুলের সুপারিশ এসেছে, তবু কোন কোন স্কুলে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বসানো হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
প্লাবন গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর মোট গোলসংখ্যা নিশ্চিত হলে স্কুল নির্বাচন শুরু হবে। কারণ আর্জেন্টিনার খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মোট কতটি মেশিন স্থাপন করা সম্ভব হবে, তা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, “ধরুন ৫০০টি স্কুলের সুপারিশ এল, কিন্তু আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী হয়তো ২৫টি স্কুল বেছে নিতে হবে। তখন আমরা দেখব কোথায় প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।”
তাঁর ভাষ্য, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে নয়, কয়েকটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়েই স্কুল নির্বাচন করা হবে।
এর মধ্যে থাকবে শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থা, স্কুলটি কতটা প্রত্যন্ত বা প্রান্তিক এলাকায় অবস্থিত, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির আন্তরিকতা এবং ভবিষ্যতে তারা এই উদ্যোগ টেকসইভাবে পরিচালনা করতে পারবে কি না।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যদি ঢাকার একটি স্কুল এবং সাতক্ষীরার গাবুরার একটি স্কুলের মধ্যে বেছে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে যেখানে প্রয়োজন বেশি। তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট এলাকার প্রতি অগ্রাধিকার নয়; বরং সম্পূর্ণ প্রয়োজনভিত্তিক সিদ্ধান্ত হবে।
এক দিনে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সব স্কুলে ভেন্ডিং মেশিন বসানো সম্ভব হবে না বলেও জানান প্লাবন।
তিনি বলেন, “এটি এমন কোনো কাজ নয় যে এক সপ্তাহের মধ্যে সব জায়গায় গিয়ে মেশিন বসিয়ে দেওয়া যাবে। আগামী কয়েক মাস ধরে ধাপে ধাপে কাজটি করা হবে।”
তিনি জানান, প্রতিটি স্কুলে ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের পর ওয়াটারএইড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই তথ্য প্রকাশ করবে, যাতে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং মানুষ জানতে পারেন তাদের দেওয়া সুপারিশ কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
কেন নিয়মিত ন্যাপকিন দেবে না ওয়াটারএইড
ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের পর নিয়মিত স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্লাবন বলেন, দীর্ঘমেয়াদে সেই দায়িত্ব ওয়াটারএইড নেবে না।
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “আমরা চাই না পরনির্ভরশীলতা তৈরি হোক। আমরা বড় বিনিয়োগ করে মেশিনটি দেব। এরপর স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি নিজেরাই নিয়মিত প্যাড রিফিল করে, তাহলে তাদের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি হবে।”
তাঁর মতে, একটি ভেন্ডিং মেশিনের সবচেয়ে বড় ব্যয় হলো সেটি স্থাপন করা। কিন্তু নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, প্যাড শেষ হলে পুনরায় ভরে দেওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো কাজ স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষেই করা সম্ভব।
“যদি স্কুল ব্যবস্থাপনা নিজেরাই এটিকে তাদের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে উদ্যোগটি দীর্ঘদিন টিকে থাকবে,” বলেন তিনি।







