মেদ বাড়ে নীরবে, রোগ আসে ধীরে ধীরে

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে স্থূলতা (Obesity) একটি বৈশ্বিক মহামারিতে পরিণত হয়েছে এবং বর্তমানে বিশ্বের এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ এতে আক্রান্ত। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন ভাস্কর্য ও শিল্পকর্ম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্থূলতা আধুনিক যুগের একচেটিয়া সমস্যা নয়; হাজার হাজার বছর আগেও এর অস্তিত্ব ছিল। বিভিন্ন যুগে কখনো স্থূলতাকে সৌন্দর্যের প্রতীক, কখনো সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার চিহ্ন, আবার কখনো রোগের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস অতিরিক্ত স্থূলতাকে স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করেন।
বাংলাদেশে স্থূলতার চিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার হার বেড়ে প্রায় ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং পুরুষদের তুলনায় নারীরা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি আক্রান্ত। শিশুদের মধ্যেও এই হার অনেক বেড়েছে। শহরাঞ্চলের সমীক্ষা অনুযায়ী ২–১৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে স্থূলতার হার ৭.৬ শতাংশ থেকে ১০.৯ শতাংশ।
স্থূলতা কী?
শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় পদার্থ জমলে সেই অবস্থাকে স্থূলতা বা ওবেসিটি বলে। আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও শক্তি সরবরাহ করে। কিন্তু অতিরিক্ত ক্যালরি, যা শরীর পোড়াতে পারে না, তা চর্বিতে পরিণত হয়ে শরীরে জমা হয়। এ থেকেই ক্রমাগত ওজন বাড়তে থাকে এবং স্থূলতা দেখা দেয়।
পরিমাপ
স্থূলতা পরিমাপের প্রধান উপায় হলো বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই)। বৈশ্বিক মান অনুযায়ী বিএমআই ৩০-এর বেশি হলে স্থূল হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় বিএমআই ২৫-এর বেশি হলে স্থূল ধরা হয়। যেকোনো স্মার্ট মোবাইলে বিএমআই ক্যালকুলেটর থাকে, যেখানে উচ্চতা ও ওজন দিয়ে সহজেই জানা যায় কেউ স্থূল কিনা।
স্থূলতার পেছনের প্রধান কারণগুলো
অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের অভাব, বংশগত (জিনগত) কারণ, হরমোনজনিত সমস্যা, মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
স্থূলতার ঝুঁকি
অতিরিক্ত ওজন হৃদরোগ, টাইপ–২ ডায়াবেটিস, ক্যানসার, অস্থিসন্ধি ও হাড়ের সমস্যা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, ফ্যাটি লিভার এবং মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
স্থূল হলে করণীয়
স্থূলতা বা ওবেসিটির ঝুঁকিতে থাকলে প্রথমেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
খাদ্যতালিকা পরিবর্তন
কঠোর ক্র্যাশ ডায়েটের পরিবর্তে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টির ঘনত্বের ওপর মনোযোগ দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে ০.৫ থেকে ০.৭৫ কেজি (১ থেকে ১.৫ পাউন্ড) স্বাস্থ্যকর ওজন কমানোর জন্য দৈনিক ৫০০ থেকে ৭৫০ ক্যালরি গ্রহণ কমানো যেতে পারে। সুষম খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয়, পরিশোধিত শর্করা (সাদা রুটি, পেস্ট্রি) এবং ভাজাপোড়া পরিহার করতে হবে।
অনেকে কিটো ডায়েট অনুসরণ করেন। সেক্ষেত্রে বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের সতর্ক থাকা জরুরি। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং (আইএফ) মাধ্যমেও অনেকে ওজন কমাতে পারেন।
নিয়মিত ব্যায়াম
ক্যালরি পোড়ানো, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং পেশির ক্ষয় রোধে নিয়মিত ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই।
অ্যারোবিক ব্যায়াম: দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতারের মতো মাঝারি ব্যায়াম ধীরে ধীরে প্রতি সপ্তাহে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট পর্যন্ত করা উচিত।
শক্তি প্রশিক্ষণ: মেদহীন পেশি গঠনের জন্য সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম (ওজন তোলা, বডিওয়েট এক্সারসাইজ) করা উচিত।
দৈনন্দিন অভ্যাসে অন্তর্ভুক্তি: সিঁড়ি ব্যবহার করা, ফোনে কথা বলার সময় দাঁড়িয়ে থাকা বা ব্যায়ামকে ১০ মিনিটের ছোট সেশনে ভাগ করে নেওয়া ভালো।
মানসিক প্রস্তুতি
ওজন কমানোর পূর্বশর্ত দৃঢ় সংকল্প। সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য (যেমন, সপ্তাহে ৫ দিন ৩০ মিনিট করে হাঁটা) নির্ধারণ করতে হবে। নিয়মিত ওজন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অগ্রগতি যাচাই করা উচিত। আবেগপ্রবণ খাওয়ার প্রবণতা (মানসিক চাপ, একঘেয়েমি বা দুঃখের কারণে অতিরিক্ত খাওয়া) চিহ্নিত করে বিকল্প উপায় খুঁজে নিতে হবে।
পরিমিত ঘুম
প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ভালো ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের অভাব ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেক সময় এত কিছুর পরও ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে সেমাগ্লুটাইড ও টিরজেপাটাইড নামক ওষুধগুলো স্থূলতা চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। দুটি ওষুধই কার্যকর এবং বর্তমানে বাংলাদেশেও পাওয়া যাচ্ছে।
তাই স্থূলতা নিয়ে উদ্বেগ নয়, প্রয়োজন প্রতিরোধ। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও স্থূলতামুক্ত জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডা. ইশরাত বিনতে রেজা; সহযোগী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ হসপিটাল







