আমেরিকানরা কেন পতাকা পোড়ায় জানেন?

প্রতি বিশ্বকাপেই বাংলাদেশে বাড়িঘরের ছাদ কিংবা কিংবা দেয়ালগুলো নানা দেশের পতাকার দখলে চলে যায়। অনেকে সে সময় মনেও করান, বাংলাদেশে জাতীয় পতাকা বিষয়ক একটা আইন আছে।
আসলে বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয় পতাকা বা জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা রক্ষায় আইন রয়েছে। এই যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
আমেরিকায় পুরুষদের প্রিয় লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন দ্যা এসকোয়্যার আজ ১৪ জুন দেশটির জাতীয় পতাকা দিবস উপলক্ষে জানাচ্ছে বিশেষ প্রেক্ষাপটে সে দেশে পতাকা পোড়ানো যায়।
চলুন, মূল লেখার সংক্ষিপ্ত অনুবাদে চোখ বুলাই।
অনেক আমেরিকানের কাছে জাতীয় পতাকা স্বাধীনতার প্রতীক। আবার অন্যদের কাছে এটি নিপীড়ন ও অন্যায়ের প্রতীক। তাই মার্কিন পতাকা আগুনে পুড়তে দেখার দৃশ্যের মতো বিতর্কিত ছবি খুব কমই আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্ল্যাগ কোড অনুযায়ী, একটি পতাকা যখন এতটাই জীর্ণ হয়ে যায় যে সেটি আর প্রদর্শনের উপযুক্ত থাকে না, তখন সেটিকে “মর্যাদার সঙ্গে, সম্ভব হলে আগুনে পুড়িয়ে” অবসর দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার রায় দিয়েছে যে প্রতিবাদ হিসেবে জাতীয় পতাকা পোড়ানোও সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী মত প্রকাশের স্বাধীনতার অংশ।
অর্থাৎ, একই কাজ—পতাকা পোড়ানো—কখনও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ, আবার কখনও প্রতিবাদের ভাষা। এসকোয়্যার কথা বলেছে এমন দুজন মানুষের সঙ্গে, যাদের জীবনে এই দুই ভিন্ন অর্থ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
শ্রদ্ধা জানাতে
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও ভেটেরান্স অব ফরেন ওয়ার্স (ভিএফডব্লিউ)-এর দীর্ঘদিনের কর্মকর্তা লিন ডব্লিউ. রলফ ৫০০টিরও বেশি পতাকা অবসর দেওয়ার অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন।
রলফ বলেন, পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা তিনি শিখেছেন তাঁর ভিয়েতনাম যুদ্ধফেরত বাবার কাছ থেকে। বাবা তাঁকে সবসময় বলতেন, পতাকা দেখলে বুকের ওপর হাত রাখতে। তাঁর মতে, পতাকা ছিঁড়ে গেলে, রং ফিকে হয়ে গেলে বা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়লে সেটিকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানানো উচিত।
তাঁর প্রথম অনুষ্ঠানটি ছিল কানসাসের ফোর্ট লিভেনওয়ার্থে। মেমোরিয়াল ডে উপলক্ষে একটি বয় স্কাউট দল ২৫ ব্যাগ পুরোনো পতাকা নিয়ে আসে। কী করবেন, তা বুঝতে না পেরে তিনি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় একটি সাধারণ ইটের চুল্লি তৈরি করে জনসমক্ষে অনুষ্ঠান আয়োজন করেন।
অনুষ্ঠানের আগে পতাকাটি নির্দিষ্ট নিয়মে ত্রিভুজ আকারে ভাঁজ করা হয়, তারপর সেটি খুলে আগুনের ওপর রাখা হয়। রলফ প্রায়ই পতাকার রঙের প্রতীকী অর্থ ব্যাখ্যা করেন—লাল সাহসের, সাদা পবিত্রতার এবং নীল শক্তির প্রতীক। অংশগ্রহণকারীরাও শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য দিতে পারেন।
প্রায় ২০ বছর আগের একটি ঘটনার কথা তিনি এখনও ভুলতে পারেন না। মেমোরিয়াল ডের এক শীতের সকালে এক কিশোর বয় স্কাউট তার ইরাকে নিহত বাবাকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা আবৃত্তি করে। নিজের অনুভূতির সঙ্গে জনি ক্যাশের Ragged Old Flag গানের কিছু অংশ মিলিয়ে সে এমন আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
এরপর পতাকাটি এমনভাবে আগুনে রাখা হয় যাতে সেটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। উপস্থিত সবাই স্যালুট করেন বা বুকে হাত রাখেন। কোথাও কোথাও বিউগলে ট্যাপস বাজানো হয় বা আনুষ্ঠানিক বন্দুকের সালাম দেওয়া হয়। রলফ নিজেও যুদ্ধে হারানো সাত সহযোদ্ধার স্মরণে কখনও কখনও বিয়ার মাটিতে ঢেলে দেন।
অনুষ্ঠান শেষে আগুন নিরাপদে নিভিয়ে ফেলা হয়। পতাকার ধাতব রিংগুলো মাটিতে পুঁতে রাখা হয়—“যেন একজন সৈনিককে শেষ বিদায় জানানো হচ্ছে।”
রলফ ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবাদ হিসেবে পতাকা পোড়ানোর সঙ্গে একমত নন। তবে তিনি স্বীকার করেন, এটি সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার। তাঁর ভাষায়, “আমরা তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রক্ষার জন্যই যুদ্ধ করেছি।”
প্রতিবাদ জানাতে
গ্রেগরি “জোই” জনসন, যার ১৯৮৪ সালের পতাকা পোড়ানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক রায় দেয়, তিনি পতাকা পোড়ানোকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখেন।
জনসনের মতে, এটি কোনো নাটকীয় কাণ্ড নয়; বরং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা, যা বিশ্বের মানুষ সহজেই বুঝতে পারে। অভিবাসনবিরোধী অভিযান, যুদ্ধ বা সরকারের অন্য কোনো নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পতাকা পোড়ানো তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তিনি জানান, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তাঁর মা একজন মার্কিন সেনাকে বিয়ে করেছিলেন। সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে বেড়ে ওঠার সময় তিনি এমন অনেক সৈনিকের সংস্পর্শে আসেন, যারা নিজেরাই যুদ্ধের বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন।
জনসনের মতে, কোথায় প্রতিবাদ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৪ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ডালাসে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে যান, যাতে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের মনোনয়নের সময় দেখা যায় যে সব আমেরিকান তাঁর নীতির সমর্থক নন।
তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মসূচির আগে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়, সমর্থকদের দিয়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হয় এবং বাধার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। ২০১৬ সালে ক্লিভল্যান্ডে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনের সময় তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের সময় পতাকা পোড়ানোর ঘোষণা দিলে পুলিশ ও পাল্টা বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হয়। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে ঘিরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছিলেন।
জনসনের পরামর্শ, সুতির কাপড়ের পতাকা ব্যবহার করা ভালো, কারণ পলিয়েস্টার সহজে গলে যায়, ঠিকমতো পোড়ে না। সঙ্গে লাইটার ফ্লুইড, প্রতিবাদের বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড এবং নিরাপত্তার জন্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখারও পরামর্শ দেন তিনি।
ক্লিভল্যান্ডে তিনি পতাকায় আগুন ধরানোর সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ভিড়ের মধ্যে ঢুকে তাঁকে মাটিতে ফেলে আটক করে। তাঁর সঙ্গে আরও ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জনসনের কথায়, “কখনও আপনাকে গ্রেপ্তার করা হবে, কখনও হবে না। কিন্তু এর পরিণতি মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”







