সিয়ার কাছে খুনটাই কেন সহজ মনে হলো

নাজিয়া আফরিন
সিয়ার কাছে খুনটাই কেন সহজ মনে হলো
সিয়ার মা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বাগদানের পর থেকে দুজনের মধ্যে কোনো সমস্যার ইঙ্গিতই তারা পাননি | ছবি: সংগৃহীত

ভারতের মহারাষ্ট্রে অবস্থিত লোহাগড় দুর্গ বেশ জনপ্রিয় ট্রেকিং স্পট। ১৮ জুন, পুনে থেকে একটু দূরে, হবু স্ত্রী সিয়া গোয়ালের সঙ্গে ভ্রমণে গিয়েছিলেন কেতন আগরওয়াল। এরপর দুর্গের চারশ ফুট গভীর খাদ থেকে ২৬ বছর বয়সী কেতনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সিয়া পুলিশকে বলেন, ছবি তুলতে গিয়ে পা ফসকে পড়ে যান কেতন। পুলিশও এটাকে আর দশটা দুর্ঘটনার মতোই দেখছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সিয়ার কথায় অসঙ্গতি, সিসিটিভি ফুটেজে এক সন্দেহজনক ব্যক্তির উপস্থিতি, সেই ব্যক্তির সঙ্গে সিয়ার দুই হাজারের বেশি ফোনকল, ২৩৮ ঘণ্টার কথোপকথন, একটি ব্যর্থ প্রথম চেষ্টা, যেখানে কেতন ঝোপ আঁকড়ে বেঁচে গিয়েছিলেন, আর তারপর দ্বিতীয়বার, যা সফল হলো। বেরিয়ে এলো দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানো একটি খুনের গল্প। অভিযুক্ত দুজন: সিয়া গোয়াল আর তার প্রেমিক চেতন চৌধুরী।

কিন্তু এটা শুধু একটি পরিকল্পিত হত্যার গল্প হলে হয়তো এত কথা লেখার দরকার পড়ত না। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে সিয়ার একটি জবাব গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, কেন তিনি পরিবারকে গিয়ে সরাসরি বলেননি যে এই বিয়েতে তার মত নেই, উত্তরে তিনি বলেন, পরিবারকে কষ্ট দিতে চাননি। বাবা-মায়ের মুখোমুখি হয়ে, ‘আমি বিয়েতে রাজি নই’ বলার চেয়ে খুনটাই তার কাছে সহজ মনে হয়েছিল।

এই লেখা সিয়ার সিদ্ধান্তের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা নয়, কোনোমতেই। একটি প্রাণ পরিকল্পনা করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তার কোনো মার্জনা নেই। কিন্তু যখন ২০ বছরের এক তরুণী স্বীকারোক্তি দেন যে নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে সৎ ও সহজভাবে কথা বলার চেয়ে খুনকে সহজ মনে হয়েছিল, তখন এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না, কোন বাস্তবতায় একজন কুড়ি বছরের মেয়ের কাছে নিজের পরিবার এতটা দুর্গম হয়ে ওঠে?

সিয়া ও কেতনের পরিবার ৩৫ বছর ধরে পরিচিত। রাজস্থানে প্রায় ১৭ কোটি টাকা খরচ করে তাদের বিয়ের আয়োজন চলছিল। তদন্তকারীদের বরাত দিয়ে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সিয়ার পরিবার চেতনের সঙ্গে সম্পর্কের কথা আগে থেকেই জানত। চেতন যোধপুরের এক মুদি দোকানি পরিবারের সন্তান। তিনি বিবিএ পড়া মাঝপথে ছেড়ে বাবার দোকানে বসতেন। আর কেতন ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে। দুই পরিবারের আর্থিক ফারাক অনেক কথাই স্পষ্ট করে দেয়। সম্পর্কটা জানা সত্ত্বেও কেতনের সঙ্গে বাগদানে সিয়াকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা একটি চেনা ছকের গল্প বলে। এখানে মেয়ের পছন্দ একটি তথ্য, পরিবারের সিদ্ধান্তের ভিত্তি নয়।

সিয়া পুলিশকে বলেছেন, কেতনের পরচুলা পরা আর তোতলামি তার অস্বস্তির কারণ ছিল। তিনি বিয়ে করতে চাননি, বিয়ে বারবার পেছানোরও চেষ্টা করেছিলেন। কেতনের বাবা পরে সাংবাদিকদের জানান, বিয়ের আগেই এই বিষয়টি সিয়া ও তার পরিবারকে জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ অপছন্দটা হঠাৎ তৈরি হয়নি। বরং অনেক আগে থেকেই জানা একটি সত্যকে পারিবারিক সম্মতির আবরণে ঢেকে রাখা হয়েছিল। আর সেই আবরণ এতটাই নিখুঁত হয়ে উঠেছিল যে সিয়ার মা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বাগদানের পর থেকে দুজনের মধ্যে কোনো সমস্যার ইঙ্গিতই তারা পাননি।

বিয়ের কেনাকাটার নাম করে কেতনের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা নিয়ে তা পুরোটাই চেতনের হাতে তুলে দেন সিয়া। পরিকল্পনাও গুছিয়ে এনেছিলেন। চেতন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার জন্য তিন বছর অপেক্ষা করবেন, কেতনের মৃত্যুর পরও সন্দেহ এড়াতে বিয়ে করবেন না। এই হিসাবি নিষ্ঠুরতার পেছনের কারণটাও লক্ষ্য করুন। পরিবারের কাছে আরও সময় চাওয়ার কোনো বৈধ উপায় নেই বলেই তারা ধরে নিয়েছিলেন।

ভারতীয় উপমহাদেশের পরিবারগুলোতে একটি মেয়েকে বড় করার পেছনে একটি শিক্ষা গাঁথা থাকে, নিজের ইচ্ছা পরে, পরিবারের মর্যাদা আগে। এই শিক্ষা পাথরে লেখা নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট লেনদেন আর সমঝোতায় এই শিক্ষা মনের গভীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কে কখন কী পরবে, তা থেকে শুরু করে কাকে বিয়ে করবে, সে পর্যন্ত। মেয়েরা শেখে, ‘ভালো মেয়ে’ পরিবারের অবাধ্য হয় না। তাই সিয়ার সেই জবাব কোনো অস্বাভাবিক মানসিকতার প্রকাশ নয়। এটা সেই শিক্ষারই একটি ভয়াবহ, বিকৃত পরিণাম।

পরিবার অবশ্য একা এই কাঠামো তৈরি করে না। বাবা-মায়েরাও বহু ক্ষেত্রে নিজেরাই একটি সার্বিক সামাজিক প্রত্যাশার প্রতিনিধি মাত্র। আত্মীয়স্বজনের কাছে মুখ রক্ষা, ব্যবসায়িক ও সামাজিক সম্পর্ক অটুট রাখা, সমাজ কী বলবে, এই হিসাব কষেই তারা সিদ্ধান্ত নেন। বিয়ে এখানে দুজন মানুষের মিলন নয়, দুই পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থান আর সম্মানের বিনিয়োগ। সেই বিনিয়োগের হিসাবের টেবিলে মেয়ের নিজের ইচ্ছার জন্য কোনো আসন বরাদ্দ থাকে না।

কয়েক মাস আগে মেঘালয়ে মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে স্বামী রাজা রাঘুবংশীকে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত হন সোনম রাঘুবংশী। সেই মামলাতেও একই ছক দেখা গিয়েছিল। বিয়ের আগে অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, পরিবার সেই সম্পর্ক অগ্রাহ্য করে বিয়ে ঠিক করে দেয়, আর মেয়েটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে নীরবে বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা পালন করে। দুটি ঘটনায় একটি প্যাটার্ন স্পষ্ট। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন উন্মাদনা নয়, এটা একটি কাঠামোগত পুনরাবৃত্তি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য কুইন্ট-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই দুটি ঘটনাকে সমান্তরালে রেখে দেখানো হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে নারীদের সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক বয়ানের স্বাভাবিকীকরণ চলছে এবং তা মূল প্রশ্নটাকেই আড়াল করে দিচ্ছে। এখানে প্রশ্নটা কোনো একজন নারীর ‘চরিত্র’ নিয়ে নয়, প্রশ্নটা সেই কাঠামো নিয়ে, যেখানে ‘ভালো মেয়ে’রা পরিবারের বিরুদ্ধে যেতে পারে না।

যে সমাজে ‘আমি বিয়ে করব না’ বলাটা অবাধ্যতা, লজ্জা, পরিবারের সম্মানহানি, কখনোই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নয়, সেখানে নীরবতা, প্রতারণা, এমনকি চরম ক্ষেত্রে সহিংসতাও বিকল্প পথ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের মর্যাদার নামে কত মেয়ে নির্যাতন সয়ে গেছে, কত বিয়ে জোর করে টিকিয়ে রাখা হয়েছে, কত মেয়ে আত্মহত্যার পথে হেঁটেছে বা খুন হয়েছে। সিয়া গোয়ালের ঘটনা আলাদা, কারণ এখানে নীরবতা গিয়ে পৌঁছেছে খুনে। কিন্তু সেই নীরবতা তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটা আলাদা কিছু নয়।

সিয়া গোয়াল আর চেতন চৌধুরীর বিরুদ্ধে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা চলছে। আইন তার নিজের পথে চলবে। পারিবারিক চাপ কোনো অজুহাত হতে পারে না একটি প্রাণহানির জন্য। কিন্তু আইনি বিচারের পাশাপাশি যে সামাজিক প্রশ্নটা এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিবরণের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে, তা হলো, আমরা কী ধরনের পরিবার আর সমাজ গড়ে তুলেছি, যেখানে একটি মেয়ের কাছে নিজের পরিবারের সঙ্গে সততার চেয়ে খুন সহজ মনে হতে পারে? উত্তরটা শুধু একটি পরিবারের মধ্যে আটকে নেই। এটা বিয়ের বাজার, পারিবারিক সম্মানের রাজনীতি আর ‘ভালো মেয়ে’ হওয়ার সামাজিক চাপ, সব মিলিয়ে তৈরি একটি কাঠামোর ফসল।