মেয়ে তুমি ফুটবলের বোঝোটা কি?

“চুপ করো। ফুটবল সম্পর্কে তুমি কী জানো? তোমার তো স্বামীর চা বানাতে রান্নাঘরে থাকার কথা।”
৭২ বছর বয়সী আঞ্জেলা বহু দশক ধরে লিভারপুলের খেলা দেখতে মাঠে যান। ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা কিংবা দীর্ঘদিনের সমর্থন সত্ত্বেও আজও তাকে এমন মন্তব্য শুনতে হয়। কারণ একটাই, তিনি নারী।
ফুটবলকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা বলা হয়। কিন্তু অনেক নারী সমর্থকের অভিজ্ঞতা বলছে, মাঠে এবং মাঠের বাইরের পরিবেশ এখনো সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত নয়।
বৈষম্যবিরোধী সংগঠন কিক ইট আউট-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমের শুরু থেকে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ফুটবল ম্যাচগুলোতে যৌনবৈষম্যমূলক আচরণের ১৩১টি অভিযোগ জমা পড়েছে। আগের মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় যা দ্বিগুণেরও বেশি।
এক নারী সমর্থক, যিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, মাঠের পরিবেশে নারীবিদ্বেষের অভিজ্ঞতার কারণে তিনি এখন আর তার মেয়েকে পুরুষদের ম্যাচে নিয়ে যান না।
তার ভাষায়, “আমি তাকে মেয়েদের ম্যাচে নিয়ে যাব, যদি সেটাও নষ্ট না হয়ে যায়। কিন্তু পুরুষদের ম্যাচে নিয়ে যাব না, অন্তত সে আরও বড় না হওয়া পর্যন্ত। আমি নিরাপদ বোধ করি না, আর মেয়েকেও এমন পরিবেশে নিয়ে যেতে চাই না।”
মাঠে নারীদের অভিজ্ঞতা
জো হিটচেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পুরুষদের ফুটবলের ছবি তোলা শুরু করেন। পরে তিনি ইংলিশ ফুটবল লিগের স্বীকৃত ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন।
কাজের সময় প্রায়ই তাকে শুনতে হয়েছে, “তুমি কি সত্যিই ফুটবল বোঝো?”
জোর ভাষায়, পুরুষদের ফুটবলের জগতে টিকে থাকতে হলে যেন অনেক কিছু মুখ বুজে সহ্য করাই নিয়ম।
তার অভিযোগ, দর্শকদের পাশাপাশি মাঠের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের শিকার হয়েছেন। অভিযোগ করেও অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রতিকার পাননি।
আরেক নারী সমর্থক জানিয়েছেন, স্টেডিয়ামের নারী শৌচাগারে পুরুষদের উপস্থিতি এতটাই সাধারণ হয়ে উঠেছিল যে সেটি প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতো।
অনলাইনে নতুন ধরনের হয়রানি
নারীদের প্রতি বৈষম্য শুধু স্টেডিয়ামে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা নিয়মিত অপমান, যৌন হয়রানি এবং হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
ডার্বি কাউন্টির সমর্থক এবং ‘হার গেম টু’ প্রচারণার স্বেচ্ছাসেবক সিমরান আতওয়াল বলেন, তার সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো অনলাইনের।
সামাজিক মাধ্যমে ছবি পোস্ট করার পর অনেক সময় সেগুলো অন্যরা নিজেদের অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেয়। এরপর শুরু হয় যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য।
তিনি বলেন, “আমি এমন কাউকে চিনি না, যে কোনো না কোনোভাবে অনলাইন হয়রানির শিকার হয়নি।”
আরও উদ্বেগজনক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নারীদের ছবি বিকৃত করার প্রবণতা। এক নারী সমর্থক জানান, তার ছবি সম্পাদনা করে এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যেন তিনি ও তার বন্ধুরা বিকিনি পরে আছেন।
যুক্তরাজ্যে এ ধরনের ‘নুডিফিকেশন’ বা অনুমতি ছাড়া ছবি বিকৃত করা বেআইনি। কিন্তু ভুক্তভোগীরা বলছেন, একবার অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে এসব ছবি পুরোপুরি মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব।
ফুটবলের বাইরেও একটি সামাজিক সমস্যা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটবলে দেখা দেওয়া নারীবিদ্বেষ আসলে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
ম্যানচেস্টার ডার্বির আগে গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশ নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্য বিষয়ে সচেতনতা তৈরির বিশেষ উদ্যোগ নেয়।
পুলিশ কর্মকর্তা কোলেট রোজের মতে, নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্য সমাজের সর্বত্র বিদ্যমান, ফুটবলও তার বাইরে নয়।
তিনি বলেন, ফুটবলের দর্শকদের বড় অংশ পুরুষ হওয়ায় মাঠের আচরণ ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে পারলে তার ইতিবাচক প্রভাব সমাজেও পড়তে পারে।
রোজের মতে, অভিযোগের সংখ্যা বাড়ার অর্থ সবসময় পরিস্থিতির অবনতি নয়। বরং মানুষ এখন এসব আচরণকে চিহ্নিত করছে, প্রতিবাদ করছে এবং অভিযোগ জানাতে আগ্রহী হচ্ছে।
কেন এই সমস্যা থেকে যাচ্ছে?
ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানী মিসিয়া গারভিস মনে করেন, পুরুষদের ফুটবলে কিছু আচরণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না, তাদের মন্তব্য অন্যদের জন্য কতটা অপমানজনক বা ক্ষতিকর।
তার মতে, অনেকের মধ্যেই এখনো এমন ধারণা আছে যে পুরুষদের ফুটবলের জগতে নারীদের জায়গা নেই।
গারভিস বলেন, বারবার অবমাননাকর মন্তব্য ও আচরণের শিকার হওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। উদ্বেগ, ট্রমা এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের (পিটিএসডি) ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
পরিবর্তনের চেষ্টা
যদিও সমস্যাটি পুরোপুরি দূর হয়নি, তবু পরিস্থিতি বদলাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বৈষম্যবিরোধী সংগঠন কিক ইট আউট ফুটবলে যৌনবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেছে। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন চালু করেছে চার বছরের সমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি কৌশল।
অনলাইন হয়রানি মোকাবিলায় নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, সমর্থক সংগঠন ও গবেষকেরা নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করছেন, যাতে স্টেডিয়ামগুলো আরও নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে।
সরকারও শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে স্কুল থেকেই লিঙ্গবৈষম্য ও নারীবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা যায়।
আঞ্জেলার আশা খুব সাধারণ, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি চান, ভবিষ্যতে কোনো নারী সমর্থক যেন বিস্ময়ের সঙ্গে বলতে পারেন, “একসময় ফুটবল ম্যাচে নারীদের এমন আচরণের শিকার হতে হতো, এটা এখন বিশ্বাসই করা যায় না।”
সেদিনই হয়তো ফুটবল সত্যিকার অর্থে সবার খেলা হয়ে উঠবে।
সূত্র: বিবিসি







