জয়নাব, কারবালার প্রথম সাক্ষী

মীর হুযাইফা আল মামদূহ
জয়নাব, কারবালার প্রথম সাক্ষী
ছবি: এআই/ রোকেয়া কালেকটিভ গ্রাফিক্স

মহরম ইসলামী ইতিহাসে বহু কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এটি হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস, আশুরার রোজার মাস। আবার এই মাসেই সংঘটিত হয়েছিল ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বেদনাবহ ঘটনাগুলোর একটি, কারবালা।

৬১ হিজরির ১০ মহরম, বর্তমান ইরাকের কারবালার প্রান্তরে, উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর পরিবার ও অল্পসংখ্যক সঙ্গী নিয়ে ইয়াজিদের বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হন। কয়েক দিন ধরে তাঁদের ফোরাতের পানি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। তারপর শুরু হয় অসম এক যুদ্ধ। একে একে ইমাম হুসাইনের (রা.) সঙ্গী, আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা নিহত হন। শেষ পর্যন্ত ইমাম হুসাইনও (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধের পর তাঁর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, নারী ও শিশুদের বন্দী করা হয় এবং তাঁদের কুফা হয়ে দামেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়।

তারপর থেকে মুসলমানরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ঘটনাকে স্মরণ করে আসছেন। কেউ শোকের মাধ্যমে, কেউ ভালোবাসার মাধ্যমে, কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবে।

আমরা সাধারণত আশুরাকে একটি যুদ্ধের সমাপ্তি হিসেবে দেখি। তবে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি অধ্যায় শুরু হয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর। আর সেই অধ্যায়ের সামনের কাতারে ছিলেন একজন নারী, জয়নাব (রা.), হজরত আলী ও হজরত ফাতিমার (রা.) জ্যেষ্ঠ কন্যা।

কারবালার দিন বিকেলে ইমাম হুসাইন (রা.) শহীদ হলেন। তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের প্রায় সবাই নিহত। শিবিরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো। বেঁচে রইলেন কেবল নারী, শিশু ও অসুস্থ আলী ইবনে হুসাইন। বাইরে বিজয়ী সৈন্যদল, ভেতরে আতঙ্ক, শোক ও অনিশ্চয়তা।

এই মুহূর্তে জয়নাবের সামনে দুটি পথ ছিল। তিনি চাইলে শোকে ভেঙে পড়তে পারতেন। নীরব থাকতে পারতেন। কারণ তাঁর হারানোর তালিকাটি ছিল অকল্পনীয়। ভাই, ভাতিজা, স্বজন, আপনজন, একদিনেই প্রায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।

বরং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যে দায়িত্বটি সবচেয়ে কঠিন, সেটিই তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।

নারী ও শিশুদের আগলে রাখা, অসুস্থ আলী ইবনে হুসাইনকে রক্ষা করা, বন্দিত্বের সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া আর সবচেয়ে বড় কথা, কারবালায় কী ঘটেছিল, সেই সাক্ষ্য পৃথিবীর সামনে পৌঁছে দেওয়া।

বন্দিদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় কুফায়। পরে দামেস্কে। ইমাম হুসাইনের (রা.) কাটা মাথা সামনে রেখে এগিয়ে চলা সেই বিজয় প্রদর্শনের শোভাযাত্রাকেই জয়নাব তাঁর প্রতিবাদের মঞ্চে পরিণত করেছিলেন।

শিয়া ঐতিহ্যের বর্ণনা অনুযায়ী, পথজুড়ে তিনি মানুষকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, তারা কোনো সাধারণ বন্দীকে নয়, রাসুল (সা.)-এর পরিবারের সদস্যদের দেখছে। কুফায় তিনি জনতার নীরবতা, অনুশোচনা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে কঠোর ভাষায় প্রশ্ন করেছিলেন।

শিয়া ঐতিহ্যে সংরক্ষিত জয়নাবের ভাষণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাতটি ইয়াজিদের দরবারে দেওয়া তাঁর খুতবা। Al-Irshad, Bihar al-Anwar এবং আবু মিখনাফনির্ভর পরবর্তী ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, বন্দী অবস্থায় ইয়াজিদের সামনে দাঁড়িয়ে জয়নাব বলেছিলেন,

“তুমি কি মনে করো, আজ আমাদের পথ সংকুচিত করে এবং আমাদের বন্দী করে তুমি আল্লাহর কাছে সম্মানিত হয়ে গেছ?… তোমার যা করার করো। আল্লাহর কসম, তুমি আমাদের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারবে না, আমাদের ওহি নিভিয়ে দিতে পারবে না।”

এই ভাষণের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশটি হলো:

“তোমার সব কৌশল প্রয়োগ করো, যত চেষ্টা করার করো। আল্লাহর কসম, তুমি আমাদের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারবে না।”

আমরা সাধারণত বীরত্ব বলতে যুদ্ধক্ষেত্র বুঝি। হাতে তরবারি, ঘোড়ার পিঠে একজন যোদ্ধা। অথচ কারবালা শেখায়, ইতিহাস গড়তে সব সময় অস্ত্র লাগে না। কখনো কখনো একটি ঘটনাকে ভুলে যেতে না দেওয়াও ইতিহাস নির্মাণের কাজ।

যদি জয়নাব নীরব থাকতেন, তাহলে কারবালা হয়তো আর দশটি পরাজিত বিদ্রোহের মতোই ইতিহাসের ভাঁজে চাপা পড়ে যেত। বিজয়ীরা সাধারণত শুধু যুদ্ধ জেতে না, ইতিহাসও লিখতে চায়। জয়নাব সেই ইতিহাসের একচ্ছত্র অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি পরাজিতদের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

ক্ষমতার ইতিহাস শুধু যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস নয়, স্মৃতি নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসও। রাষ্ট্র বা শাসকগোষ্ঠী শুধু মানুষকে পরাজিত করতে চায় না, তারা চায় মানুষ ঘটনাগুলো কীভাবে মনে রাখবে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী মরিস হালবওয়াক্স collective memory নিয়ে লিখতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন, স্মৃতি কখনোই শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; সমাজই ঠিক করে কোন ঘটনাকে মনে রাখা হবে, কোনটি ভুলে যাওয়া হবে। কারবালার পর জয়নাব যেন সেই সামাজিক স্মৃতির প্রথম রক্ষক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নিশ্চিত করেছিলেন, ঘটনাটি শুধু নিহত মানুষের সংখ্যা হয়ে থাকবে না; এটি ন্যায় ও অন্যায়ের প্রশ্ন হিসেবেও বেঁচে থাকবে।

আমরা সাধারণত ধর্মের ইতিহাস পুরুষদের ইতিহাস হিসেবেই শুনি। নবী, খলিফা, সেনাপতি, যুদ্ধ, সাম্রাজ্য। কিন্তু আশুরার ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্য এক স্মৃতি। সেখানে মুসলমানরা শুধু ইমাম হুসাইনের (রা.) শাহাদাতকে স্মরণ করেন না, তাঁরা স্মরণ করেন এমন একজন নারীকেও, যিনি কারবালার ঘটনাকে ইতিহাসের ভেতর জীবিত রেখেছিলেন।

শিয়া ঐতিহ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্বাস আছে। তারা মনে করেন, জয়নাবের সাক্ষ্য কারবালার প্রান্তরে শেষ হয়ে যায়নি। পৃথিবীতে তিনি যেমন শহীদদের পক্ষে কথা বলেছিলেন, কিয়ামতের ময়দানেও তেমনি মজলুমদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। ঐতিহাসিকভাবে এই বিশ্বাস যাচাই করার সুযোগ নেই; এটি ঈমান ও ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের বিষয়। কিন্তু বিশ্বাসটি একটি গভীর ধারণা বহন করে, সত্যের সাক্ষ্য কখনো একটি দিনের কাজ নয়। কিছু সাক্ষ্য ইতিহাস পেরিয়ে আখিরাত পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

সম্ভবত এই কারণেই কারবালা শুধু শাহাদাতের ইতিহাস নয়, এটি সাক্ষ্যেরও ইতিহাস। ইমাম হুসাইন (রা.) অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার শিক্ষা দিয়েছিলেন। আর জয়নাব শিখিয়েছিলেন, সেই আত্মত্যাগকে ভুলে যেতে না দেওয়াও এক ধরনের ইবাদত।