চকলেটের সঙ্গে আসলেই কি নারীর বিশেষ সম্পর্ক?

চকলেট শুধু একটি খাবার নয়, এটি ঘিরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গল্প, মিথ আর সামাজিক ধারণা। দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়ে আসছে, নারীরা নাকি পুরুষদের তুলনায় চকলেট বেশি পছন্দ করেন। আবার অনেকের বিশ্বাস, মাসিকের সময় চকলেট খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যায়। কিন্তু ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান ও শ্রমবাজার নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণা বলছে, চকলেটের সঙ্গে নারীদের সম্পর্ক কেবল স্বাদের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুসংস্কার, বৈষম্য, শোষণ, এমনকি ঔপনিবেশিক ইতিহাসও।
চলুন জেনে নেওয়া যাক নারী ও চকলেট সম্পর্কে এমন ছয়টি তথ্য, যা অনেকেরই অজানা।
১. নারীরা চকলেট বেশি পছন্দ করেন, এমন প্রমাণ নেই
অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা মনোবিজ্ঞানের গবেষক ক্যাথরিন জানসন-বয়েডের মতে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি চকলেট পছন্দ করেন, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রভাব থেকেই এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন, জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও নানা সামাজিক বার্তায় বারবার এমন ধারণা তুলে ধরা হয়েছে যে, বিশেষ করে মাসিকের আগে নারীদের চকলেট খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু গবেষকদের মতে, এ দাবির পক্ষে শক্ত কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
চকলেটবিষয়ক গবেষক ও লেখক সু কুইন বলেন, হাজার হাজার বছর আগে চকলেট ওষুধ, ধর্মীয় আচার এবং শক্তিবর্ধক পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। যুদ্ধে যাওয়ার আগে সৈন্যদের এবং সন্তান জন্মদানের সময় প্রসূতি নারীদের শক্তি জোগাতেও এটি দেওয়া হতো।
তবে স্প্যানিশরা আমেরিকায় এসে চকলেটের এই ব্যবহার দেখে সন্দিহান হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যেসব নারী চকলেট তৈরি ও চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করতেন, তাঁদের ঘিরে নানা নেতিবাচক গল্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়। গবেষকদের মতে, সেখান থেকেই নারীদের সঙ্গে চকলেটের সম্পর্ক নিয়ে বহু প্রচলিত ধারণার জন্ম।
১. একসময় চকলেটকে নারীদের মানসিক অস্থিরতার কারণ মনে করা হতো
অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের কিছু চিকিৎসক হিস্টেরিয়া বা মানসিক অস্থিরতার জন্য চকলেটকে দায়ী করতেন।
সু কুইন তাঁর গবেষণায় একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এক ইংরেজ যাজকের বর্ণনায় বলা হয়, মেক্সিকোর চিয়াপাস অঞ্চলের একদল স্প্যানিশ নারী এতটাই চকলেটপ্রেমী ছিলেন যে গির্জায় প্রার্থনার সময় চকলেট পান না করার নির্দেশও তাঁরা মানেননি।
পরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁদের চকলেটে ‘আসক্ত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ধীরে ধীরে সমাজে এমন ধারণা গড়ে ওঠে যে নারীরা চকলেটের প্রতি অস্বাভাবিকভাবে নির্ভরশীল।
১. কোকো চাষের শ্রমশক্তির বড় অংশই নারী
চকলেটের বিজ্ঞাপনে নারীদের সাধারণত ভোক্তা হিসেবে দেখানো হয়। অথচ কোকো উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ এমা রবার্টসনের মতে, বিশ্বজুড়ে কোকো খাতের শ্রমশক্তির প্রায় ৬৮ শতাংশই নারী।
অনেকের ধারণা, নারীরা শুধু কোকো ফল থেকে বীজ বের করার মতো কাজ করেন। বাস্তবে তাঁরা কীটনাশক ছিটানো, আগাছা পরিষ্কার, জমির পরিচর্যা এবং ফসল উৎপাদনের নানা শ্রমসাধ্য কাজেও যুক্ত। শুধু মাঠেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চকলেট কারখানাতেও শ্রমিকদের বড় একটি অংশ নারী।
১. বেশি কাজ করেও নারী কোকো চাষিরা কম আয় করেন
ফেয়ারট্রেডের তথ্য অনুযায়ী, একই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েও নারী কোকো চাষিরা পুরুষদের তুলনায় কম মজুরি পান।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী নিয়াগয় নিয়ঙ্গ’ও বলেন, অনেক নারী দিনে মাত্র ২৩ পেন্স সমপরিমাণ আয় করেন। এটি আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার অনেক নিচে এবং পুরুষদের আয়ের প্রায় পাঁচ গুণ কম।
এই বৈষম্য কমাতে ন্যূনতম মূল্য নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত প্রিমিয়াম প্রদান এবং নারী কৃষকদের ক্ষমতায়নে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনার কথা জানিয়েছে ফেয়ারট্রেড।
১. চকলেট শিল্পের ইতিহাসে রয়েছে দাসশ্রমের অধ্যায়
চকলেটের ইতিহাস শুধু সুস্বাদু খাবারের ইতিহাস নয়, এটি ঔপনিবেশিক শোষণ ও দাসশ্রমের ইতিহাসও বহন করে।
এমা রবার্টসনের গবেষণা বলছে, ব্রিটিশ চকলেট শিল্প দীর্ঘদিন নির্ভর করেছে ব্রিটিশ উপনিবেশ পশ্চিম আফ্রিকার ঘানা ও নাইজেরিয়া থেকে আমদানি করা কোকোর ওপর।
বিশ শতকের শুরুতে প্রকাশ পায়, ব্রিটিশ কিছু চকলেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান পর্তুগিজ পশ্চিম আফ্রিকায় উৎপাদিত কোকো কিনছিল। সেখানে শ্রমব্যবস্থার নাম ছিল ‘চুক্তিভিত্তিক শ্রম’, কিন্তু বাস্তবে তা ছিল দাসশ্রমেরই আরেক রূপ।
আজও চকলেট শিল্পের এই ইতিহাস ন্যায্য বাণিজ্য, শ্রমিকের অধিকার এবং নৈতিক ভোক্তাবাদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
১. ডার্ক চকলেট স্বাস্থ্যকর, তবে অলৌকিক কোনো খাবার নয়
ডার্ক চকলেটে সাধারণ চকলেটের তুলনায় চিনির পরিমাণ কম। এ কারণে একে তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর বলা হয়।
কোকোতে এমন কিছু জৈব উপাদান রয়েছে, যেগুলো রক্তচাপ কমানো বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে সু কুইনের ভাষায়, এসব গবেষণায় যে পরিমাণ কোকো ব্যবহার করা হয়েছে, সাধারণ ডার্ক চকলেট খেয়ে সেই মাত্রায় পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ শুধু স্বাস্থ্যগত উপকার পাওয়ার আশায় বেশি পরিমাণ ডার্ক চকলেট খাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তাঁর মতে, ডার্ক চকলেট কোনো স্বাস্থ্যকর ওষুধ নয়। তবে পরিমিত পরিমাণে প্রিয় খাবার উপভোগ করা শরীর ও মনের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি







