তপ্ত দুপুরে লুকিয়ে থাকা প্রাণঘাতী বিপদ: হিট স্ট্রোক

একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। গত ১০০ বছরে পৃথিবীর গড় পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা প্রতি শতকে প্রায় ০.৬° সেলসিয়াস হারে বেড়েছে। ভবিষ্যতে চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাগুলোর তীব্রতা, সংখ্যা, স্থায়িত্ব ও তাপমাত্রা এমন হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।
বাংলাদেশেও গত দুই দশকে মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ গরম দিনের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ২০০০ সালে বছরে প্রায় ৪৬ দিন অনুভূত তাপমাত্রা ছিল ৩৫° সেলসিয়াসের বেশি। কিন্তু ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১২০ দিনে পৌঁছেছে, অর্থাৎ ১৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা মানবস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশের আর্দ্রতা বেড়েছে। এ কারণে শরীরের ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হতে পারে না। ফলে শরীরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি গরম অনুভূত হয়।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এ বছর তাপদাহজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। তাই আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তীব্র তাপদাহে তাপজনিত অবসাদ (Heat Exhaustion) থেকে শুরু করে প্রাণঘাতী হিট স্ট্রোক পর্যন্ত হতে পারে।
হিট স্ট্রোক কী?
হিট স্ট্রোক হলো এমন একটি অবস্থা, যখন শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে যায়। এ অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত ৪০° সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়ে যায় এবং শরীর আর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে পারে না।
কেন হিট স্ট্রোক হয়?
হিট স্ট্রোকের প্রধান কারণগুলো হলো—
* দীর্ঘ সময় প্রচণ্ড রোদ বা গরম পরিবেশে অবস্থান করা।
* গরম আবহাওয়ায় কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করা।
* অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীরে পানি ও লবণের ঘাটতি হওয়া।
* পর্যাপ্ত পানি পান না করা।
* বদ্ধ ও বাতাসহীন পরিবেশে কাজ করা।
* উচ্চ আর্দ্রতার কারণে ঘাম বাষ্পীভূত না হওয়া।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বৃদ্ধ ও শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কম থাকায় তাঁদের হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। এ ছাড়া শ্রমজীবী মানুষ, যেমন রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক ও খনিশ্রমিকেরাও বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
কিছু ওষুধ, বিশেষ করে মানসিক রোগের ওষুধ, এবং নিয়মিত অ্যালকোহল সেবনের কারণেও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণ
শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে তীব্র মানসিক ও আচরণগত পরিবর্তন দেখা দেয়। রোগী প্রচণ্ড বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন, কথাবার্তা জড়িয়ে যেতে পারে, খিটখিটে মেজাজ বা প্রলাপ বকার মতো অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারেন। একপর্যায়ে মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা তীব্র খিঁচুনি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
এর পাশাপাশি রোগীর তীব্র মাথাব্যথা হতে পারে। বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। একই সঙ্গে হৃদ্স্পন্দনের গতি বেড়ে যায় এবং রোগী দ্রুত ও ঘন ঘন শ্বাস নিতে থাকেন।
তাৎক্ষণিক বা প্রাথমিক চিকিৎসা
হিট স্ট্রোকের পূর্বলক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগীকে দ্রুত অপেক্ষাকৃত শীতল স্থানে নিয়ে যেতে হবে। ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। ফ্যান চালিয়ে দিতে হবে বা বাতাস করতে হবে। রোগী সচেতন থাকলে প্রচুর পানি বা খাবার স্যালাইন পান করাতে হবে। কাঁধ, বগল ও কুঁচকিতে বরফ বা ঠান্ডা সেঁক দেওয়া যেতে পারে। অবস্থার উন্নতি না হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
হিট স্ট্রোক প্রতিরোধের উপায়
হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে সচেতনতা এবং কিছু সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গরমের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও খাবার স্যালাইন পান করতে হবে। তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে নিয়মিত তরল গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষ করে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত, যখন সূর্যের তাপ সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া বা রোদে কাজ করা এড়িয়ে চলা উচিত।
বাইরে বের হলে হালকা রঙের, ঢিলেঢালা ও সুতির পোশাক পরিধান করা ভালো। এসব পোশাক শরীরকে তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে ছাতা, টুপি বা ক্যাপ ব্যবহার করে সরাসরি রোদের প্রভাব থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায়।
যাঁরা দীর্ঘ সময় বাইরে বা রোদে কাজ করেন, তাঁদের নির্দিষ্ট সময় পরপর বিশ্রাম নেওয়া এবং ছায়াযুক্ত স্থানে কিছুক্ষণ অবস্থান করা প্রয়োজন। শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিতে বেশি থাকায় তাঁদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।
এ ছাড়া ঘর ও কর্মস্থলে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত তাপ জমে না থাকে।
বাংলাদেশে চরম গরম এখন আর ব্যতিক্রম নয়; এটি ধীরে ধীরে নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। তাপজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু-অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি।
তাই মনে রাখুন—
‘সূর্যমামার সঙ্গে নয় বীরত্বের লড়াই,
ছায়ায় থাকুন, পানি পান করুন,
এটাই বুদ্ধিমানের বড়াই।’
ইশরাত বিনতে রেজা পপুলার মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক







