হাসপাতাল থেকে গর্ভফুল পাচারের অভিযোগ, তৈরি হয় বার্ধক্যরোধী ইনজেকশন

রোকেয়া কালেকটিভ ডেস্ক
হাসপাতাল থেকে গর্ভফুল পাচারের অভিযোগ, তৈরি হয় বার্ধক্যরোধী ইনজেকশন
ছবি: র‍্যান্ডি আর্মস্ট্রং আর্ট

সন্তান জন্মের পর গর্ভফুল বা প্লাসেন্টার কাজ শেষ হয়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী এটি চিকিৎসাবর্জ্য হিসেবে ধ্বংস করার কথা। কিন্তু পাকিস্তানে অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতাল থেকেই এসব গর্ভফুল সংগ্রহ করে একটি আন্তর্জাতিক চক্র বিদেশে পাচার করছিল। পরে সেগুলো দিয়ে তৈরি করা হতো হাজার ডলার মূল্যের বার্ধক্যরোধী ইনজেকশন।

এমন অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ)। সংস্থাটির অভিযোগ, চক্রটি বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কেজি মানব গর্ভফুল সংগ্রহ করে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার পর বিদেশে পাঠাত।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিবিসি নিউজ উর্দুকে জানিয়েছেন, গত মাসের শেষ দিকে রাজধানী ইসলামাবাদে অভিযান চালিয়ে একটি অবৈধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থেকে ৫০০ কেজি গর্ভফুল উদ্ধার করা হয়, যা মানবদেহের বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এফআইএর প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, একটি বাড়িকে গর্ভফুল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার কারখানায় রূপান্তর করা হয়েছিল। সেখানে ট্রলির ওপর সারি সারি ট্রেতে শুকানোর জন্য রাখা ছিল বিপুল পরিমাণ গর্ভফুল।

পাকিস্তান হিউম্যান অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট অথরিটির কর্মকর্তা হিনা কানওয়াল জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রতিটি গর্ভফুলের জন্য প্রায় ২ দশমিক ৯০ মার্কিন ডলার দিতেন। তার ভাষ্য, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা ছাড়া এমন একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

তদন্তকারীদের দাবি, বিদেশে পাঠানোর পর এসব গর্ভফুল থেকে বার্ধক্যরোধী ইনজেকশন তৈরি করা হতো। প্রতিটি ইনজেকশনের বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ৫৩০ মার্কিন ডলার।

কানওয়াল বলেন, প্রসাধনী ও সৌন্দর্যচর্চা শিল্পে মানব গর্ভফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে পাকিস্তানে গর্ভফুল কেনাবেচা সম্পূর্ণ অবৈধ।

দেশটির আইনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মানব অঙ্গ সংগ্রহ বা বিক্রির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৩ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

এফআইএর দাবি, চক্রটির কার্যক্রম শুধু ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। লাহোর, পেশোয়ারসহ আরও কয়েকটি বড় শহরেও এর নেটওয়ার্ক বিস্তৃত ছিল। তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে অভিবাসন কর্মকর্তা, চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এবং কয়েকটি হাসপাতালকেও।

এর আগে অবৈধ মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন নিয়ে একাধিক অভিযান চালানো হলেও মানব গর্ভফুল পাচারের এমন সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সন্ধান এবারই প্রথম পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে এফআইএ।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দাবি করেছিলেন, তারা ভেড়ার গর্ভফুল নিয়ে কাজ করতেন। পরে তারা স্বীকার করেন, এগুলো মানব গর্ভফুল।

এদিকে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ভিয়েতনামগামী ১০০ কেজি মানব গর্ভফুল জব্দ করা হয়েছে। ভিয়েতনামে মানব গর্ভফুল ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও পশুর গর্ভফুল ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।

এ পর্যন্ত এ ঘটনায় মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা সবাই বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

হাসপাতাল থেকে গর্ভফুল কীভাবে অপসারণ করা হয়?

পাকিস্তানের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সাদাফ তারিক বলেন, গর্ভফুলকে অত্যন্ত সংক্রামক চিকিৎসাবর্জ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই এটি অপসারণের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা হয়।

শিশুর জন্মের পরপরই গর্ভফুল আলাদা করে বিশেষ হলুদ রঙের বায়োহ্যাজার্ড ব্যাগে সিল করে রাখা হয়। এরপর তা প্রসূতি কক্ষ বা অপারেশন থিয়েটার থেকে হাসপাতালের শীতল সংরক্ষণাগারে পাঠানো হয়, যাতে এটি পচে না যায়।

তার ভাষ্য, গর্ভফুল সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা সংরক্ষণ করা যায়। এরপর অন্যান্য চিকিৎসাবর্জ্যের মতো উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতালেই একই নিয়ম অনুসরণ করার কথা।

সরকার অনুমোদিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে। হাসপাতাল থেকে বর্জ্য গ্রহণের সময় বিস্তারিত নথি সংরক্ষণ করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তা পর্যালোচনা করে।

গর্ভফুল কী, কেন এত চাহিদা?

গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা হলো গর্ভাবস্থায় জরায়ুর ভেতরে তৈরি হওয়া একটি অস্থায়ী অঙ্গ। নাভিরজ্জুর মাধ্যমে এটি ভ্রূণকে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করে এবং বর্জ্য অপসারণে সহায়তা করে। স্বাভাবিক প্রসবে শিশুর জন্মের পর এটি নিজে থেকেই বের হয়ে আসে। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা এটি অপসারণ করেন।

অনেকের বিশ্বাস, প্রোটিন, আয়রন ও চর্বি সমৃদ্ধ গর্ভফুল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও উপকারী। বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় এর নির্যাস ব্যবহার হয়ে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান পোলারিসের তথ্য অনুযায়ী, বৈধ প্লাসেন্টাভিত্তিক বৈশ্বিক বাজারের বর্তমান মূল্য ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০৩৪ সালের মধ্যে এর বাজার ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই বাজারে শূকর, ভেড়া, ঘোড়া এবং মানব গর্ভফুলের নির্যাসের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। পোলারিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক নীতিন তাম্বে বলেন, গর্ভফুল শুধু গর্ভাবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও এর সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে।

কোথায় ব্যবহার হয়?

গর্ভফুল থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্য মূলত বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে বলিরেখা, চুল পড়া, মেনোপজ-সংক্রান্ত সমস্যা, বন্ধ্যত্ব এবং আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা।

এ ছাড়া গর্ভফুলে থাকা ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মতো হরমোন বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতার চিকিৎসাতেও এগুলো ব্যবহার করা হয়।

গবেষণায় স্ট্রোক, পারকিনসনস রোগ, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম, পেশির দুর্বলতা, লিভারের রোগ, ক্রোনস ডিজিজ এবং কিছু ক্যানসারের চিকিৎসায়ও প্লাসেন্টার ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণা চলছে।

সাদাফ তারিক বলেন, গর্ভফুলের ভেতরের স্তরে থাকা গ্রোথ ফ্যাক্টর ক্ষত, মারাত্মক দগ্ধ হওয়া, আলসার এবং চোখের আঘাতের চিকিৎসায়ও কাজে লাগতে পারে। তবে এসব ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সব ক্ষেত্রে সমান শক্তিশালী নয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও ভিন্ন।

এশিয়ায় বাড়ছে চাহিদা, চীনে নিষিদ্ধ হলেও সক্রিয় কালোবাজার

জাপানের জাপান বায়ো প্রোডাক্টস (জেবিপি) এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মানব, শূকর ও ঘোড়ার গর্ভফুল থেকে তৈরি গুঁড়া ক্যাপসুল খাদ্য-পরিপূরক হিসেবে রপ্তানি করে।

প্রতিষ্ঠানটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ব্যবস্থাপক উইনস্টন ওই বলেন, এশিয়ার অনেক মানুষ প্লাসেন্টাভিত্তিক পণ্যের প্রতি তুলনামূলক বেশি আগ্রহী। বিশেষ করে চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরেই এর ব্যবহার রয়েছে।

চীনে মানব গর্ভফুলের বাণিজ্যিক বিক্রি নিষিদ্ধ। তবু কালোবাজার ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভিন্ন নামে এটি কেনাবেচা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

চীনের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল টাইমস-কে এক বিক্রেতা জানান, তিনি একটি মানব গর্ভফুল ৫০ ডলারেরও বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন। বেশি পরিমাণে কিনলে দাম কমানো হয়।

একজন আইন বিশেষজ্ঞের মতে, বর্তমানে জরিমানার পরিমাণ কম হওয়ায় অপরাধীরা নিরুৎসাহিত হন না। জরিমানার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলে এ ধরনের অপরাধ কমতে পারে।

চীনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাবিদ্যার একজন ফার্মাসিস্ট জানান, অতীতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং হাঁপানি বা ব্রঙ্কাইটিসের চিকিৎসায় মানব গর্ভফুল ব্যবহার করা হতো।

তবে সাংহাই পিপলস হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হুয়াং চেংশেং সতর্ক করে বলেন, যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত না করা গর্ভফুল খেলে এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি বা সিফিলিসের মতো সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে।

তারপরও চীনে অনেক নতুন মা নিজের গর্ভফুল ধ্বংস না করে বাড়িতে নিয়ে যান। কেউ পরিবারের সদস্যদের খাওয়ান, আবার কেউ গর্ভফুল গুঁড়া করে ক্যাপসুল বানিয়ে সংরক্ষণ করেন। পূর্ব চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশে এমন ক্যাপসুল তৈরির সেবারও চাহিদা রয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।