থানা-হাসপাতাল-আদালতের নারীবিদ্বেষী মনোভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না: নারী সংস্কার কমিশন

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
থানা-হাসপাতাল-আদালতের নারীবিদ্বেষী মনোভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না: নারী সংস্কার কমিশন
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাদের বহুল আলোচিত প্রতিবেদন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা জমা দেয় | ছবি: Chief Advisor GOB ফেসবুক পেজ

প্রথম তিন পর্বে নারী সংস্কার কমিশনের সংবিধান, আইন ও নারীর অধিকার, নারী উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং স্থানীয় সরকারে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিয়ে কমিশনের সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছিল। আজকের পর্বে থাকছে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, বিচারব্যবস্থার সংস্কার এবং সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠনে কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশ।

নারী সংস্কার কমিশনের মতে, নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও কাঠামোগত বৈষম্যের একটি প্রকাশ। পরিবার থেকে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন, জনপরিসর এবং অনলাইন—সব জায়গাতেই নারীরা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

কমিশনের সদস্যরা তাঁদের সুপারিশে বলেছেন, কেবল আইন কঠোর করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য প্রয়োজন বৈষম্যমূলক আইন সংস্কার, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং নারী-পুরুষের সম্পর্ককে সমতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

এর মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশ নারী গত এক বছরের মধ্যেই সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। কিশোরী ও প্রতিবন্ধী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সঙ্গে অনলাইনেও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা দ্রুত বাড়ছে।

কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীদের বড় একটি অংশ অনলাইনে হয়রানি, যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য, অশ্লীল ছবি পাঠানো কিংবা সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

বাল্যবিবাহকেও নারীর প্রতি সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বৈষম্য তৈরি করে।

কমিশনের মতে, নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ কেবল অপরাধ নয়; বরং সমাজের গভীরে প্রোথিত বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনও অনেক ক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্কে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা, পারিবারিক সহিংসতাকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা এবং সালিশের মাধ্যমে আপসের চাপ সৃষ্টি করার প্রবণতা এখনও বহাল রয়েছে।

কমিশনের মতে, সমাজে এখনও নারীর পরিচয়কে স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং স্ত্রী, মা কিংবা কন্যার পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। এই মানসিকতাই বৈষম্য ও সহিংসতার ভিত্তিকে শক্তিশালী করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনসহ একাধিক আইন রয়েছে।

তবে কমিশনের মতে, প্রধান সমস্যা আইনের অভাব নয়; বরং বাস্তবায়নের দুর্বলতা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলা তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, পুলিশের অদক্ষতা, সরকারি আইনজীবীদের অবহেলা, আদালতের বিলম্ব এবং বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে অনেক ভুক্তভোগী শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পান না।

বিশেষ করে দরিদ্র, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী এবং প্রান্তিক নারীদের জন্য বিচারপ্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

কমিশন আরও বলেছে, অনেক ক্ষেত্রেই থানা, হাসপাতাল ও আদালতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নারীবিদ্বেষী মনোভাব এবং সংবেদনশীলতার অভাব ভুক্তভোগীদের বিচারপ্রাপ্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এসব সমস্যা মোকাবিলায় কমিশন একাধিক আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে।

কমিশন ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়নির্বিশেষে নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে ঐচ্ছিক অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের সুপারিশ পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, দেনমোহর, উত্তরাধিকার এবং অভিভাবকত্বে সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলেছে।

কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং এ বিষয়ে পৃথক আইন প্রণয়নের সুপারিশও রয়েছে।

প্রতিবেদনে বৈবাহিক সম্পর্কে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে ফৌজদারি আইনে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নারীবিদ্বেষী প্রচারণা, বিশেষ করে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে নারীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে সময়োপযোগী আইন প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে।

কমিশনের মতে, শুধু আইন সংশোধন যথেষ্ট নয়; বিচারপ্রক্রিয়াও নারীবান্ধব করতে হবে।

এ জন্য থানা, আদালত ও হাসপাতালে নারী, শিশু, প্রবীণ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য হেল্প ডেস্ক চালু করা, দোভাষী ও ইশারা ভাষার সেবা নিশ্চিত করা এবং ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আরও সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে পুলিশ, বিচারক, আইনজীবী এবং চিকিৎসকদের জন্য বাধ্যতামূলক জেন্ডার-সংবেদনশীল প্রশিক্ষণের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

যৌন সহিংসতার বিচার দ্রুত করতে ফরেনসিক পরীক্ষার আধুনিকীকরণ, মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি এবং উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত মেডিকোলিগ্যাল সেবা সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছে কমিশন।

পাশাপাশি অনলাইনে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মোকাবিলায় বিভিন্ন সংস্থার বিচ্ছিন্ন সাইবার ইউনিট একীভূত করে সমন্বিত জাতীয় সাইবার ক্রাইম ইউনিট গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

কমিশনের মতে, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে কেবল আইন নয়, সামাজিক মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে স্কুলের পাঠ্যক্রমে জেন্ডার সমতা, সম্মতির ধারণা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং অনলাইন নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে গণসচেতনতা কর্মসূচির মাধ্যমে এই ধারণা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে যে, ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতা ভুক্তভোগীর লজ্জা নয়; বরং অপরাধীর দায়।

প্রতিবেদনের শেষ অংশে কমিশন বলেছে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করা নয়। বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে নারীকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে সম্মান করা হবে, বৈষম্যমুক্ত পরিবেশে নিরাপদ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত হবে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নারীর মর্যাদা ও মানবাধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।