ম্যানোস্ফিয়ার, টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি এবং যে বিষ আমাদের তরুণরা গিলছে

অন্ধকার মঞ্চ। উত্তেজক সুর ও লয়ের ওঠানামায় আলো-আঁধারির খেলায় আবির্ভূত হন এক সুঠামদেহী পুরুষ। পেশিবহুল দুই বাহু ওপরে তুলে মুঠিবদ্ধ করে ইঙ্গিত দেন শক্তির, ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে এনে নিজের যৌনাঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “পুরুষ যৌনাঙ্গকে সম্মান করুন, নারীর যৌনাঙ্গকে বশীভূত করুন।” মিলনায়তনভর্তি পুরুষেরা উন্মত্তের মতো সাড়া দেন। ১৯৯৯ সালে পল টমাস অ্যান্ডারসন পরিচালিত “ম্যাগনোলিয়া” চলচ্চিত্রের এই দৃশ্যে টম ক্রুজ অভিনয় করেছিলেন ফ্র্যাংক টিজে ম্যাকি চরিত্রে, এক মোটিভেশনাল স্পিকার, যে পুরুষদের “প্রকৃত পুরুষ” হয়ে উঠতে শেখায়। তার সেমিনারের নাম “সিডিউস অ্যান্ড ডেস্ট্রয়”, নারীদের প্রলুব্ধ করে ধ্বংস করো। ম্যাকি মঞ্চ থেকে ঘোষণা করে, “এটা জৈবিক, এটা পাশবিক, আমরা… পুরুষ!” সেই পারফরম্যান্স ক্রুজকে অস্কার মনোনয়ন এনে দিয়েছিল, একজন খলনায়কের চরিত্রে।
আজ, প্রায় তিন দশক পরে, সেই খলনায়ক সোশ্যাল মিডিয়ার নায়ক। ফ্র্যাংক ম্যাকি আর কাল্পনিক নয়। সে কোটি ফলোয়ারের সত্যিকারের আইডল।
একটি মহামারির অ্যানাটমি
২০২৫ সালের মার্চে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ব্রিটিশ মিনিসিরিজ “অ্যাডোলেসেন্স” সেই বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। সিরিজে এক ১৩ বছরের কিশোর ইন্টারনেটে ম্যানোস্ফিয়ারের ইনসেল মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার কিশোরী সহপাঠীকে হত্যা করে। সিরিজটি এতটাই তোলপাড় ফেলে যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, দেশজুড়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সচেতনতামূলক অভিযান চালানো হয়, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য তৈরি হয় বিশেষ নির্দেশনা। কিন্তু এটি কেবল ব্রিটেনের সমস্যা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক মহামারি, যার নাম ম্যানোস্ফিয়ার।
ম্যানোস্ফিয়ার কোনো একটি ওয়েবসাইট বা সংগঠন নয়। এটি একটি আদর্শিক ক্ষেত্র, পরস্পর-সংযুক্ত ফোরাম, সাবরেডিট, ইউটিউব চ্যানেল, টিকটক অ্যাকাউন্ট এবং পডকাস্টের এক বিশাল নেটওয়ার্ক, যেখানের সকলে বিশ্বাস করে যে সমাজ অতিরিক্ত নারীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, পুরুষদের “প্রকৃত জীবন” যাপন করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং নারীবাদ আসলে পুরুষের বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। কিন্তু এই বিশ্বাসের গভীরে পৌঁছাতে হলে তার অভ্যন্তরীণ কাঠামোটা বুঝতে হবে। কারণ ম্যানোস্ফিয়ার কোনো একক মতাদর্শ নয়, এটি একটি পাইপলাইন।
পাইপলাইনের স্তরগুলো
প্রথম স্তর: পিক-আপ আর্টিস্ট্রি
৯০-এর দশকে উদ্ভূত পিক-আপ আর্টিস্ট্রি বা পিইউএ আন্দোলনটি দাবি করত যে নারীকে “জয়” করা শিখতে হয়। একটি কৌশলগত খেলা, যেখানে সঠিক কৌশল খাটিয়ে যেকোনো নারীকে বশ করা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারী একজন মানুষ নয়, সে একটি ধাঁধা, সঠিক কোড এন্ট্রি করলে “আনলক” হয়ে যাবে। “নেগিং” (কাউকে হেয় করে তার মনোযোগ আকর্ষণ করা), “ফ্রেম কন্ট্রোল” (আলাপে আধিপত্য বজায় রাখা), এই পরিভাষাগুলো আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হয়, কিন্তু এর মূলে আছে একটি মৌলিক অবমাননা: নারীর সম্মতি ও সত্তাকে একটি খেলায় পরিণত করা।
দ্বিতীয় স্তর: রেড পিল
“ম্যাট্রিক্স” চলচ্চিত্র থেকে ধার করা এই রূপকটি ম্যানোস্ফিয়ারের কেন্দ্রীয় মেটাফর। নীল বড়ি গিললে তুমি ঘুমিয়ে থাকো: নারীবাদ, সমতা, ভদ্রতার মিথ্যা দুনিয়ায়। লাল বড়ি গিললে তুমি “সত্য” দেখতে পাও: তথাকথিত “হাইপারগ্যামি”, যেখানে নারী সব সময় উচ্চতর মর্যাদার পুরুষকে খোঁজে, যেখানে প্রেম আসলে একটি লেনদেন, যেখানে সাম্যবাদী মূল্যবোধ পুরুষকে ক্ষমতাহীন করার অস্ত্র।
রেড পিল মতাদর্শে “আলফা মেল” ও “বেটা মেল”-এর একটি জৈবিক শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। আলফারা শাসন করে, আকর্ষণ করে, সম্পদ ও নারী অর্জন করে। বেটারা, যাদের “সিম্প” ডাকা হয়, নারীকে তোষামোদ করে এবং তাই চিরকাল প্রত্যাখ্যাত হয়। এই ডিসকোর্সে নারী-পুরুষের জটিল সম্পর্ককে একটি প্রাইমেট ডমিন্যান্স হায়ারার্কিতে নামিয়ে আনা হয় এবং সেই হায়ারার্কিতে ওপরে থাকার প্রতিযোগিতায় নারী পুরস্কার, পুরুষ প্রতিযোগী।
তৃতীয় স্তর: এমজিটিওডব্লিউ
“মেন গোয়িং দেয়ার ওন ওয়ে”, এই আন্দোলন রেড পিলের একটি বিশেষ উপসংহারে পৌঁছায়: যেহেতু নারীরা মূলত ক্ষতিকর ও বিশ্বাসঘাতক, সেহেতু সমাধান হলো তাদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া। সম্পর্ক নয়, বিয়ে নয়, এমনকি যৌনতাও নয়। কারণ সবকিছুই শেষ পর্যন্ত পুরুষের শোষণে পরিণতি পায়। এমজিটিওডব্লিউকে শুরুতে একটি ব্যক্তি-স্বাধীনতার বয়ান মনে হয়, কিন্তু এর মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি হলো গভীর বিচ্ছিন্নতা এবং পুরুষত্বকে শুধুমাত্র নারীর অনুপস্থিতিতে সংজ্ঞায়িত করার একটি বিকৃত তাগিদ।
চতুর্থ স্তর: ইনসেল বা “অনিচ্ছাকৃত ব্রহ্মচারী”
পাইপলাইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রান্তটি এখানে। “ইনভলান্টারি সেলিবেট” বা ইনসেল পরিচয়টি মূলত তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। ১৯৯৩ সালে আলানা নামের এক কানাডীয় নারী একটি সহায়তা প্রদানকারী ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন সেই সব মানুষের জন্য, যারা রোমান্টিক সম্পর্ক থেকে বঞ্চিত এবং সে কারণে কষ্ট পাচ্ছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সহানুভূতি ও সংযোগ। কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোতে ইনসেল পরিচয়টি একটি অন্ধকার মতাদর্শে রূপান্তরিত হয়েছে।
আধুনিক ইনসেল সাবকালচারে “ব্ল্যাকপিল” নামে একটি নির্মম ডিসকোর্স বিরাজ করে: তোমার জীবনের পরিণতি মূলত তোমার শারীরিক রূপ দ্বারা পূর্বনির্ধারিত। উচ্চতা, চোয়ালের গড়ন, নাকের আকৃতি, এই বিষয়গুলো নির্ধারণ করে তুমি যৌন ও সামাজিক সাফল্য পাবে কি না। “লুকসম্যাক্সিং” (চেহারার সর্বোচ্চ উন্নতির প্রচেষ্টা, প্লাস্টিক সার্জারি থেকে চোয়াল বা হাড়ের অস্ত্রোপচার পর্যন্ত), “কোপস” (এই বাস্তবতা মেনে নেওয়ার মানসিক কৌশল) এবং সবচেয়ে ভয়ানক, “লুক্সম্যাক্স অর রোপ” (সৌন্দর্য অর্জনের চেষ্টা, নইলে আত্মহত্যা), এই পরিভাষাগুলো একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
ইনসেল মতাদর্শের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর সহিংস প্রকাশ। ২০১৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় এলিয়ট রজার ছয়জনকে হত্যা করে একটি ম্যানিফেস্টো রেখে যায়, যেখানে সে নারীদের প্রতি তার ঘৃণা এবং প্রত্যাখ্যানের প্রতিশোধের কথা লেখে। ম্যানোস্ফিয়ারের কিছু অংশে সে “সেন্ট এলিয়ট” নামে পরিচিত। তার সহিংসতা এখন উদ্যাপনের বিষয়। ২০১৮ সালে টরন্টোতে আলেক মিনাসিয়ান পথচারীদের ওপর ভ্যান চালিয়ে ১০ জনকে হত্যা করে। তার ফেসবুক পোস্টে সে “ইনসেল বিদ্রোহ” ঘোষণা করেছিল।
এই হত্যাকাণ্ডগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো একটি মতাদর্শের যৌক্তিক পরিণতি, যেখানে নারীর প্রত্যাখ্যানকে একটি অপরাধ হিসেবে এবং সহিংস প্রতিক্রিয়াকে একটি ন্যায্য প্রতিশোধ হিসেবে ফ্রেম করা হয়।
অ্যান্ড্রু টেট এবং মহামারির মুখপাত্র
ম্যানোস্ফিয়ারের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুখপাত্র হলেন অ্যান্ড্রু টেট। সাবেক কিকবক্সার থেকে সোশ্যাল মিডিয়া মোগল টেটের ব্র্যান্ড হলো ধন, বিলাসিতা, শারীরিক শক্তি এবং নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ। তার বার্তা সহজ: পুরুষ হওয়া মানে দুর্বলতাকে অস্বীকার করা, আবেগকে পদদলিত করা এবং বস্তুগত সাফল্য ও যৌন আধিপত্যের মাধ্যমে নিজের মূল্য প্রমাণ করা। ব্রিটেনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬-১৭ বছর বয়সী প্রায় ৮০ শতাংশ ব্রিটিশ ছেলে তার কনটেন্ট দেখেছে।
২০২৩ সালে রোমানিয়ার সর্ববৃহৎ সংগঠিত অপরাধ দমন সংস্থা ডিআইইসিওটি টেট ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, মানব পাচার এবং একটি অপরাধী সংঘ গঠনের অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা সাতজন নারীকে প্রেমের ভান করে ফাঁদে ফেলে যৌন শোষণ করে এবং পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরিতে বাধ্য করে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর টেট তার অনুসারীদের কাছে আরও বড় আইকন হয়ে ওঠেন। কারণ ম্যানোস্ফিয়ারে রাষ্ট্রীয় শাস্তি মানেই “নিপীড়ন”, ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিজয়ের নিশান।
কিন্তু টেট শুধু একটি ব্যতিক্রম নন, তিনি একটি বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজির সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ মাত্র। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাম্প্রতিক তদন্তমূলক তথ্যচিত্র “ম্যানোস্ফিয়ার মেসায়াস”-এ সাংবাদিক জ্যাকি ওয়েকফিল্ড এক বছর ধরে অনুসরণ করেছেন মেক্সিকোর এল তেমাচ (প্রকৃত নাম লুইস কাস্তিয়েহা) এবং কেনিয়ার অ্যান্ড্রু কিবেকে, দুজন আঞ্চলিক ম্যানোস্ফিয়ার মসিহা, যাঁদের অনুসরণকারীর সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এল তেমাচ শুধু ইউটিউব লাইভস্ট্রিম থেকেই বছরে প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলার আয় করেন বলে বিবিসির অনুমান। মেক্সিকোয় একজন নারী জানিয়েছেন, তার সাবেক সঙ্গী এল তেমাচের ভিডিও ব্যবহার করতেন নিজের নিয়ন্ত্রণমূলক ও নিপীড়নমূলক আচরণকে ন্যায্যতা দিতে। কেনিয়ায় শিক্ষার্থীরা দেখছেন, তাদের পুরুষ সহপাঠীরা কিবের কনটেন্ট দেখার পর নারীদের প্রতি ক্রমশ বৈরী হয়ে উঠছে। কেনিয়ার লিঙ্গ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. আউইনো ওকেচের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, কিবে স্থানীয় আখ্যান ও জাতীয় প্রেক্ষাপট ব্যবহার করে সমাজের বিদ্যমান অনিশ্চয়তাগুলোকে জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগান। মঞ্চ বদলায়, ম্যাকির কণ্ঠস্বর বদলায় না।
অ্যালগরিদম যেভাবে পাইপলাইন তৈরি করে
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ১৪২ জন তরুণের টিকটক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে প্ল্যাটফর্মটি তরুণদের পরিচিত সাংস্কৃতিক ভাষায়, পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে, ধীরে ধীরে নারীবিদ্বেষী মতাদর্শ পৌঁছে দেয়। যাত্রা শুরু হয় একটি ট্রাইসেপ এক্সটেনশন টিউটোরিয়াল দিয়ে। তারপর আসে “আলফা মাইন্ডসেট” ভিডিও। তারপর “নারীরা কেন বিশ্বাসযোগ্য নয়।” তারপর রেড পিল। তারপর ইনসেল ফোরাম।
প্রতিটি পদক্ষেপে আরও গভীর সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতি প্রদান করা হয়। “ম্যানোস্ফিয়ার মেসায়াস” তথ্যচিত্রে বিবিসি তরুণ অনুসরণকারীদের ব্রাউজিং ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে কীভাবে নিরীহ সেলফ-হেলপ বা ফিটনেস কনটেন্ট থেকে ফিড ক্রমশ মেরুকৃত ও নারীবিদ্বেষী ভিডিওর দিকে বিবর্তিত হয়। অ্যালগরিদম এত কিছু জানে না, এটি শুধু এনগেজমেন্টকে পুরস্কৃত করে, আরও ছড়িয়ে দেয়। আর ক্ষোভ, বঞ্চনা, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব সবচেয়ে বেশি এনগেজমেন্ট উৎপাদন করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
১২ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর দেশে, যেখানে তরুণদের একটি বিশাল অংশ টিকটক ও ইউটিউবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়, এই পাইপলাইনটি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে একটি বিশেষ কারণে: এখানে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো আগে থেকেই বিদ্যমান। ম্যানোস্ফিয়ার এখানে একটি নতুন মতাদর্শ আনছে না। এটি পুরোনো বিশ্বাসগুলোকে একটি আধুনিক, আকর্ষণীয়, “বৈজ্ঞানিক” ভাষা দিচ্ছে।
টেটের ভিডিও যখন বাংলায় ডাব হয়ে বা সাবটাইটেলসহ ছড়িয়ে পড়ে, তখন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি ছেলেও নিজেকে সেই বৈশ্বিক “আলফা” পরিচয়ের অংশ ভাবতে শুরু করে। “ম্যানোস্ফিয়ার মেসায়াস”-এ বিশেষজ্ঞরা যে বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন, এই ইনফ্লুয়েন্সাররা স্থানীয় অনিশ্চয়তা ও কিশোর-তরুণদের জন্য সহায়তা কাঠামোর অনুপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে জটিল সমস্যার সরলীকৃত সমাধান বিক্রি করেন, সেই একই প্যাটার্ন এখানেও কাজ করছে। নারীর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, শিক্ষায় মেয়েদের অগ্রগতি, এই পরিবর্তনগুলোকে ম্যানোস্ফিয়ারের ভাষায় “হুমকি” হিসেবে ফ্রেম করা সহজ হয়ে পড়ছে। ফলে যে ছেলেটি সত্যিকারের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভুগছে, সে একটি সহজ উত্তর পেয়ে যায়, দোষ নারীর, দোষ নারীবাদের, দোষ “সিস্টেমের।”
আসল শিকার
এই প্রক্রিয়াটা সূক্ষ্ম, আর সেটাই এটাকে বিপজ্জনক করে। কেউ একদিনে নারীবিদ্বেষী হয় না। ম্যানোস্ফিয়ার তরুণদের প্রকৃত, বৈধ কষ্টগুলো খুঁজে নেয়: একাকীত্ব, প্রেম না পাওয়ার যন্ত্রণা, পরিচয়ের সংকট, অর্থনৈতিক বঞ্চনা। এই মানবিক দুর্বলতাগুলোর বিপরীতে একটি সহজ, আকর্ষণীয় উত্তর দেওয়া হয়: “তুমি দুর্বল কারণ নারীরা তোমাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তোমার ব্যর্থতার কারণ তুমি নও, কারণ নারীবাদ।”
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো এই মতাদর্শের শিকার শুধু নারীরা নয়। পুরুষরা তার চেয়েও বড় শিকার। পুরুষ আবেগ প্রকাশ করতে পারে না, কাঁদতে পারে না, দুর্বলতা স্বীকার করতে পারে না, কারণ ম্যানোস্ফিয়ার তাকে শিখিয়েছে, এগুলো “বেটা” আচরণ। যে পুরুষ বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতার জন্য আকুল, কিন্তু সব সম্পর্ককে একটি আধিপত্যের খেলা মনে করে কাছে আসতে পারছে না। যে পুরুষ একাকীত্বে ভুগছে এবং সেই একাকীত্বের দায় দিচ্ছে সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে।
আলো নিভে গেলে যা থাকে
“ম্যাগনোলিয়া”তে ফ্র্যাংক ম্যাকির পরিণতি কী? মঞ্চের আলো নিভে গেলে, মুখোশ খুলে গেলে, বেরিয়ে আসে একজন ভাঙা মানুষ। মৃত্যুশয্যায় পড়ে থাকা বাবার কাছে যে হাঁটু গেড়ে কাঁদছে। অ্যান্ড্রু টেটের চকচকে ফেরারি, তার হাভানা সিগার, তার শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারের পেছনে কি একজন মানুষ নেই, যিনি ভয় পান? যিনি ব্যর্থতা লুকান? যিনি নিজের পুরুষত্ব প্রমাণ করতে অন্যকে দমনের আশ্রয় নেন?
সত্যিকারের পৌরুষ সেই মঞ্চের আলোয় নয়। সত্যিকারের পৌরুষ হলো অন্ধকারেও দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতায়, কাঁদতে পারার সাহসে, প্রত্যাখ্যানের পর আবার উঠে দাঁড়ানোর মনোবলে এবং সেই যন্ত্রণাকে অন্য কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র না বানানোর পরিপক্বতায়।







