ফ্রিদা কাহলোর ছবিতে স্থান পাওয়া প্রাণীরা কি তাঁর না হওয়া সন্তানদের বিকল্প?

রোকেয়া কালেকটিভ ডেস্ক
ফ্রিদা কাহলোর ছবিতে স্থান পাওয়া প্রাণীরা কি তাঁর না হওয়া সন্তানদের বিকল্প?
The Wounded Deer | ছবি: বিবিসি

মেক্সিকান চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলো এক বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক প্রতীক, যাকে শিল্পসমালোচকেরা ‘ফ্রিদাম্যানিয়া’ (Fridamania) বলে থাকেন। ১৯৫৪ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তাঁর অকালমৃত্যু হয়। এরপর থেকেই তাঁর জনপ্রিয়তা কেবল বেড়েছে।

লন্ডনের টেট মডার্ন (Tate Modern)-এ আয়োজিত ‘ফ্রিদা: দ্য মেকিং অব অ্যান আইকন’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে সম্প্রতি আবারও তারই প্রমাণ মিলেছে। কাহলোর আত্মপ্রতিকৃতিগুলো কেবল শৈল্পিক উপস্থাপনা নয়, তাঁর বর্ণিল অথচ যন্ত্রণাময় জীবনের এক নিবিড় মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্র।

কাহলোর শিল্পকলা মূলত তাঁর ‘মেস্তিজা’ (Mestiza) উত্তরাধিকার, অর্থাৎ মেক্সিকোর আদিবাসী ও ইউরোপীয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ এবং তাঁর নিজস্ব ধারার ‘জাদুকরী বাস্তববাদ’ (Magic Realism)-এর অনন্য মেলবন্ধন। ছোটবেলায় তিনি পোলিওতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আঠারো বছর বয়সে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় পড়ে আজীবন শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দিয়েগো রিভেরার সঙ্গে তাঁর উত্তাল সম্পর্ক। এসবই তাঁর শিল্পে মিলেমিশে রয়েছে। তিনি নিজের ইচ্ছেমতো আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন, কোনো প্রথাগত শৈলীর তোয়াক্কা করেননি। সেখানে রয়েছে আবেগ, ট্রমা এবং অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

১৯৪০ সালে আঁকা এই মাস্টারপিসটি ফ্রিদা কাহলোর জীবনের এক চরম নাটকীয় মুহূর্তে সৃষ্টি। দিয়েগো রিভেরার সঙ্গে তাঁর বিয়ে ভেঙে গেছে। আলোকচিত্রী নিকোলাস মারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কেরও অবসান ঘটেছে।

ছবির পটভূমিতে রয়েছে ঘন ক্রান্তীয় সবুজ পাতা। এই সজীবতার মাঝে ফ্রিদাকে দেখা যায় শান্ত কিন্তু স্থির অভিব্যক্তিতে। কিউরেটর টোবিয়াস ওস্ট্র্যান্ডারের মতে, দর্শকের দিকে তাঁর সরাসরি তাকিয়ে থাকার ভঙ্গিটি কোনো প্রতিরোধ বা জড়তা নয়, বরং একধরনের অবিচল সত্যকে তুলে ধরে।

ছবিতে ফ্রিদাকে একটি কাঁটার হার পরা অবস্থায় দেখা যায়। এই হার তাঁর ত্বক ভেদ করে রক্তের ধারা বইয়ে দিচ্ছে। এই কাঁটার হার মূলত ‘religious martyrdom’ বা ধর্মীয় আত্মত্যাগের ইঙ্গিত দেয়। ওস্ট্র্যান্ডারের ভাষায়, “তৎকালীন সময়ে একজন নারী শিল্পী হিসেবে নিজেকে যিশু খ্রিস্টের রূপে উপস্থাপন করা ছিল এক দুঃসাহসিক ও অভাবনীয় বিষয়।”

ছবিতে থাকা মৃত হামিংবার্ডের আকৃতিটি ফ্রিদার নিজস্ব জোড়া ভ্রুর প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করে, যা শিল্পীর মুখমণ্ডল ও ঝুলন্ত বস্তুটির মধ্যে এক অদ্ভুত দৃশ্যকাব্য তৈরি করে। এ ছাড়া তাঁর চুলে থাকা প্রজাপতি ক্লিপ এবং গাঢ় বেগুনি সুতোর বিনুনি তাঁর নিজস্ব রুচির পরিচয় দেয়।

কাহলোর চিত্রে ব্যবহৃত প্রতিটি প্রাণী মেক্সিকান লোককথা এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গভীর প্রতীক বহন করে।

হামিংবার্ড: এই পাখি স্বাধীনতা এবং হারানো ভালোবাসার প্রতীক। মেক্সিকান লোককথা অনুযায়ী এটি হারানো প্রেম ফিরে পাওয়ার কবজ। এটি অ্যাজটেক (Aztec) যুদ্ধদেবতা হুইতজিলোপোচতলির প্রতীক।

বানর (Spider Monkey): সৃজনশীলতা ও আবেগীয় ক্ষতের প্রতীক। এটি দিয়েগো রিভেরার উপহার দেওয়া পোষা প্রাণী। প্রাক্-হিস্পানিক সংস্কৃতিতে এটি উর্বরতার প্রতীক। ছবিতে এটি কাঁটার হার নিয়ে খেলছে, যা ফ্রিদার রক্তপাত ঘটাচ্ছে।

কালো বিড়াল : সুপ্ত শক্তি ও সুরক্ষার বার্তা দেয়। ওস্ট্র্যান্ডারের মতে, বিড়ালটি এখানে অশুভ সংকেত নয়; বরং এটি ready to pounce, অর্থাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত এক রক্ষক শক্তি। এটি কাহলোর অন্তিম সুরক্ষাকবচ।

ফ্রিদা এঁকেছেন ড্রাগনফ্লাই-ফুল (Dragonfly flowers), যা পুনর্জন্ম ও রূপান্তরের প্রতীক। আদিবাসী মেক্সিকান সংস্কৃতিতে ড্রাগনফ্লাই বা ফড়িং আত্মার পুনর্জন্মের প্রতীক। এটি তাঁর জীবনের জাদুকরী বাস্তববাদী উপাদানের বহিঃপ্রকাশ।

কাহলোর কাজে ফ্যান্টাসি বা উদ্ভট উপাদান থাকলেও তিনি নিজেকে পরাবাস্তববাদী বা সাররিয়েলিস্ট মানতে নারাজ ছিলেন। ১৯৫৩ সালে Time ম্যাগাজিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেন:

“তারা আমাকে পরাবাস্তববাদী ভাবত, কিন্তু আমি তা ছিলাম না। আমি কখনো স্বপ্ন আঁকিনি। আমি আমার নিজস্ব বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছি।”

ইউরোপীয় পরাবাস্তববাদ যেখানে অবচেতন মনের বিমূর্ত কল্পনা নিয়ে কাজ করত, কাহলো সেখানে মেক্সিকোর নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে ‘জাদুকরী বাস্তববাদ’ খুঁজে নিয়েছিলেন। ‘ড্রাগনফ্লাই-ফুল’-এর মতো উপাদানগুলো কোনো অবাস্তব স্বপ্ন নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর আত্মিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগের বাস্তব প্রতিফলন।

মেক্সিকো সিটির উপকণ্ঠে কাহলোর বাড়ি ‘কাসা আজুল’ (নীল বাড়ি) ছিল তাঁর নিজস্ব স্বর্গ। কিউরেটর টোবিয়াস ওস্ট্র্যান্ডার একে বিষাদময় কোনো স্থান না বলে ‘নোহের নৌকা’ (Noah’s Ark)-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। শারীরিক অক্ষমতার কারণে ঘরবন্দী জীবনে তাঁর পোষা বানর, হরিণ, বিভিন্ন পাখি এবং ‘সেনিয়োর শোলোতল’ (Señor Xólotl) নামের বিশেষ মেক্সিকান কুকুরটি ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। উল্লেখ্য, ‘শোলোতল’ (Xólotl) নামটির উৎসও অ্যাজটেক পুরাণ।

অনেকে মনে করেন, এই প্রাণীরা তাঁর না হওয়া সন্তানদের বিকল্প বা ‘সারোগেট চাইল্ড’ ছিল। তবে ওস্ট্র্যান্ডার এই ধারণাকে কেবল সন্তানহীনতার সহজ সমীকরণে সীমাবদ্ধ না রেখে বলেন, “তারা ছিল তাঁর জীবনের গভীর স্নেহ এবং যৌবনের প্রতীক (sites of affection and representation of youth)।”

১৯৪৬ সালের The Wounded Deer ছবিতে ফ্রিদা নিজেকে একটি তীরবিদ্ধ হরিণ হিসেবে দেখান, যার পাদদেশে লেখা ছিল carma বা কর্মফল, যা নিয়তি হিসেবে তাঁর যন্ত্রণাকেই নির্দেশ করে।

ফ্রিদা কাহলোর জীবন ছিল চরম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক অদম্য লড়াই। ১৯৫৩ সালে ডান পা কেটে ফেলার পর ডায়েরিতে লেখা তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি আজও কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা।

কাহলোর শিল্পকর্ম আমাদের শেখায়, কীভাবে ব্যক্তিগত ভাঙন এবং শারীরিক যন্ত্রণাকে শিল্পের এক অবিনশ্বর শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও তিনি জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, “আমি অসুস্থ নই। আমি ভেঙে পড়েছি। কিন্তু যতক্ষণ আমি ছবি আঁকতে পারছি, ততক্ষণ আমি বেঁচে থাকতে পেরে সুখী।”

সূত্র: বিবিসি। অনূদিত ও ঈষৎ সম্পাদিত।