উচ্চশিক্ষার পথে নারীর বাধা: সমাজের প্রশ্ন, “বিয়ে কবে?”

বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে যখন একজন অবিবাহিত নারী এগিয়ে যেতে চান, তখন তাঁর লড়াই শুধু ভিসা, স্কলারশিপ বা একাডেমিক চাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁকে প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হয় সমাজের তৈরি করে রাখা কিছু অদৃশ্য দেয়াল, কিছু ‘স্টেরিওটাইপ’ এবং কিছু অবমূল্যায়ন।
বাস্তবতা হলো, এই মন্তব্যগুলো বেশিরভাগ সময়ই আসে নিজের পরিবার কিংবা নিজ দেশের মানুষের কাছ থেকে, যারা নিজেরাও বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন বা আমাদের সমাজে ‘উচ্চশিক্ষিত’ হিসেবে পরিচিত।
একজন অবিবাহিত নারী হিসেবে আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়, “তোমার তো কোনো দায়িত্ব নেই”, “স্বামী-সন্তান থাকলে বুঝতে”, “তোমার তো কাউকে রান্না করে খাওয়াতে হয় না”, কিংবা “বাচ্চা না থাকলে জীবন তো সহজই।” হয়তো কোনো আড্ডায়, কোনো কমিউনিটি গ্যাদারিংয়ে, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে কেউ হেসে বলে উঠল।
এই কথাগুলো হয়তো অনেকের কাছে সাধারণ মন্তব্য মনে হতে পারে, কিন্তু এই মন্তব্যগুলো আসলে আমাদের গভীর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ইঙ্গিত করে। এখানে নারীর পরিচয়কে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়, যেন একজন নারী তখনই “পূর্ণ” যখন তিনি স্ত্রী ও মা হতে পারেন। তাঁর ব্যক্তিসত্তা, স্বপ্ন, একাডেমিক পরিচয় কিংবা পেশাগত অর্জন যেন দ্বিতীয় সারির বিষয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আসলে “Invisible Labor” বা অদৃশ্য শ্রমের ধারণার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সমাজ নারীর মানসিক শ্রম, আবেগগত দায়িত্ব এবং আত্মত্যাগকে স্বাভাবিক ধরে নেয়, সেগুলোকে অনেক সময় কাজ হিসেবেই স্বীকার করে না।
সমাজবিজ্ঞানে “Gender Role Theory” বলে একটি তত্ত্ব আছে, যেখানে বলা হয় সমাজ নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা ভূমিকা তৈরি করে দেয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, নারীদের ক্ষেত্রে সেই ভূমিকা সাধারণত যত্ন নেওয়া, রান্না করা, সন্তান পালন বা সংসার সামলানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয় যত্নশীল হতে, সংসার সামলাতে, রান্না করতে, অন্যের প্রয়োজনকে নিজের আগে রাখতে। অন্যদিকে পুরুষদের শেখানো হয় উপার্জন, নেতৃত্ব এবং স্বাধীনতার ধারণা।
ফলে সমাজ ধীরে ধীরে এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যেখানে নারীর মূল্যায়ন হয় তিনি কতটা “ভালো স্ত্রী” বা “ভালো মা” হতে পারছেন, তার ভিত্তিতে।
ফলে একজন নারী যদি এই নির্ধারিত ছকের বাইরে গিয়ে নিজের শিক্ষা, গবেষণা বা ক্যারিয়ারকে অগ্রাধিকার দেন, তখন সমাজ তাঁর পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে। যেন একজন নারী তাঁর বৈবাহিক অবস্থা ছাড়া আর কোনো পরিচয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন না। কিংবা একজন নারী তাঁর জন্য উপযুক্ত ‘সঙ্গী’র জন্য অপেক্ষা করতে পারেন না।
কিন্তু একজন মেয়ের বাবা-মাও তাঁর পরিবার। তাঁদের পাশে থাকা, তাঁদের নিয়ে চিন্তা করা, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সংগ্রাম করা, এগুলোও দায়িত্বের অংশ। মানসিক চাপ, একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা, বিদেশে নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম, এসবও বাস্তব।
অথচ সমাজের চোখে অবিবাহিত নারীর এই পরিশ্রম বা মানসিক চাপ অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, এবং এই প্রবণতায় নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউনেস্কোসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ৫০ থেকে ৭০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে স্কলারশিপ, গবেষণা ও উন্নত ক্যারিয়ারের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন অনেক নারী। কিন্তু এই যাত্রাতেও তাঁদের প্রায়ই শুনতে হয়, ‘বিয়ে কবে?’ কিংবা ‘সংসার করবে না?’— যেন একজন নারীর অর্জনের চেয়ে তাঁর বৈবাহিক অবস্থাই সমাজের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া কিছু শিক্ষার্থী বা তাঁদের পরিবারদের মধ্যেও একই রকম সংকীর্ণ মানসিকতা দেখা যায়। আমরা মনে করি, মাস্টার্স বা পিএইচডি পর্যায়ে পড়তে যাওয়া মানুষরা হয়তো আরও উদার, সহনশীল ও মুক্তচিন্তার হবেন। কারণ উচ্চশিক্ষা শুধু ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গিরও বিকাশ ঘটায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেকেই এখনো নারীর জীবনকে বিয়ে, সন্তান ও সংসারের মানদণ্ডে বিচার করেন।
একজন নারী অবিবাহিত মানেই তাঁর জীবন “সহজ”, এই ধারণা শুধু ভুলই নয়। এটি নারীর সংগ্রামকে অস্বীকার করারও নামান্তর।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো “Patriarchy” বা পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। পিতৃতন্ত্র এমন একটি সামাজিক কাঠামো, যেখানে পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধই “স্বাভাবিক” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ব্যবস্থায় নারীর শ্রমকে প্রায়ই অদৃশ্য করে রাখা হয়, আবার একই সঙ্গে তাঁকে সেই শ্রমের মধ্যেই আবদ্ধ থাকতে বলা হয়।
মজার বিষয় হলো, একজন অবিবাহিত নারী যদি রান্না না করেন বা সন্তানের যত্ন না নেন, তখন তাঁর জীবনকে “সহজ” বলা হয়; কিন্তু তাঁর একাডেমিক সংগ্রাম, মানসিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, একাকীত্ব বা পরিবারের প্রতি দায়িত্বকে দায়িত্ব হিসেবেই ধরা হয় না।
বিয়ে, মাতৃত্ব বা বৈবাহিক অবস্থা কখনোই একজন মানুষের মর্যাদা, পরিচয় বা সক্ষমতার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।
একজন নারী গবেষক হতে পারেন, শিক্ষক হতে পারেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে পারেন, পরিবারকে সমানভাবে ভালোবাসতে পারেন। এবং এসবের জন্য তাঁকে অপরাধবোধে ভুগতে হবে না। একজন নারীর জীবনের মূল্য শুধু তাঁর “কারো স্ত্রী” বা “কারো মা” হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।







