ডা. সুষমা-কুশলের বিচ্ছেদ নিয়ে এত আলোচনা কেন?

ফেসবুকে রাকিবুল ইসলাম, যিনি নিজেও একজন অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, লিখেছেন, "ডা. কুশল আর ডা. সুষমা রেজারও বিচ্ছেদ হয়ে গেল। এখন কেবল ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের ডায়াবেটিস হওয়া বাকি!" এক দিনের মধ্যেই পোস্টটিতে জমেছে প্রায় ৩৯ হাজার প্রতিক্রিয়া।
এরপর ডা. জাহাঙ্গীর কবির ১৪ মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। মাত্র সাত ঘণ্টায় সেটি দেখা হয় ১৩ লাখবার। ভিডিওটির নিচে আবার কেউ মন্তব্য করেন, "এখন কেবল ডা. রাকিবুল ইসলামের কোমরব্যথা দেখার অপেক্ষা।"
আবার একজন লিখেছেন, "ডা. জাহাঙ্গীরের কি কোনো রসবোধ নেই? একটু ঠাট্টা, হাসি-তামাশাও স্পোর্টিংলি নিতে পারেন না?" সেই পোস্টের মন্তব্যে আরেকজনের প্রশ্ন, "কোনটা হাসি-তামাশার বিষয়? বিচ্ছেদ? নাকি একজন চিকিৎসক হয়ে আরেকজন চিকিৎসকের অসুস্থতা কামনা করা?"
এই কয়েকটি পোস্টই বলে দেয়, একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কীভাবে মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জাতীয় আলোচনায় পরিণত হতে পারে।
ঘটনা হলো, প্রায় দুই দশকের দাম্পত্য জীবনের পর জনপ্রিয় কাপল থেরাপিস্ট দম্পতি ডা. সুষমা রেজা ও ডা. সায়েদুল আশরাফ কুশল বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে বিশ্লেষণ, অনুমান, সমালোচনা, সহানুভূতি, আবার কোথাও কোথাও ট্রল।
ফেসবুকে ঢুকলেই মনে হচ্ছে, বিচ্ছেদের কারণ যেন সবাই জেনে গেছেন। কেউ সম্পর্কের ভেতরের গল্প বলছেন, কেউ চরিত্র বিশ্লেষণ করছেন, কেউ পুরোনো বক্তব্য টেনে এনে বিচার বসাচ্ছেন। এমনকি গত কয়েক দিনে তাঁদের সম্পর্কে যত "তথ্য" তৈরি হয়েছে, তার অনেকটাই হয়তো এই দুই মানুষও নিজেদের সম্পর্কে জানতেন না।
কয়েক দিন আগে একটি সিনেমা দেখছিলাম। শুরুতেই দেখা যায়, একজন ডিভোর্স আইনজীবী তাঁর কাছে আসা এক দম্পতিকে বলছেন, তাঁরা যেন নিজেদের সম্পর্ককে আরেকটি সুযোগ দেন। কিছুদিন আলাদা থেকে, শান্তভাবে ভেবে আবার কথা বলেন। পরের দৃশ্যেই দেখা যায়, সেই আইনজীবী নিজেই তাঁর কাপল থেরাপিস্টকে বলছেন, "আমি আর পারছি না। যত দ্রুত সম্ভব এই বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বের হতে চাই।"
জীবন আসলে এমনই।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরও ক্যান্সার হতে পারে। একজন সাংবাদিকও একদিন খবরের শিরোনাম হতে পারেন। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞও নিজের মানসিক সংকটে আরেকজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে পারেন। ঠিক তেমনি, একজন কাপল থেরাপিস্টেরও বিচ্ছেদ হতে পারে।
অবশ্য শুধু বাংলাদেশের কথাই বা বলি কেন? কয়েক বছর আগে জনপ্রিয় ইউটিউব দম্পতি খালিদ ও সালামার বিচ্ছেদের পরও বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে মুসলিম সমাজে, একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। মানুষ যেন মনে করেছিল, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে নিজেদের বিশ্বাসও ভেঙে গেছে।
ডা. সুষমা ও ডা. কুশলের ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই হয়েছে।
অনেকে তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেই প্রশ্ন একেবারে খারিজ করে দেওয়ার মতো নয়। কারণ ডা সুষমা একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি চর্মরোগের পরামর্শ না দিয়ে দাম্পত্য জীবন নিয়ে কথা বলতেন।
তাঁরা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার নামে অপ্রয়োজনীয় আপসের পরামর্শ দিতেন এমন অভিযোগও রয়েছে। কেউ বলেছেন, তাঁরা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে কাউন্সেলিংয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতেন। কেউ আবার পুরোনো ভিডিও টেনে এনে বলেছেন, "বাচ্চা নিলে সম্পর্ক ঠিক হয়ে যাবে" ধরনের পরামর্শ বৈজ্ঞানিক ছিল না। এমনকি সংসার টিকিয়ে রাখার দায় নারীর, নারী সবসময় স্বামীর অনুগত থাকবে এমন ধারণা প্রচারেরও অভিযোগ আছে তাঁদের বিরুদ্ধ।
আবার অনেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মতে, ভালো দুই মানুষেরও বিচ্ছেদ হতে পারে। বরং বিষাক্ত সম্পর্ক টেনে নেওয়ার চেয়ে সম্মানজনক বিচ্ছেদ অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। এতে পারিবারিক সহিংসতা, আত্মহত্যা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক যন্ত্রণা কমতে পারে।
অর্থাৎ, বিচ্ছেদের খবরটি যেন অনেকের জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। আবার অনেকের কাছে এটি ছিল বিচ্ছেদকে স্বাভাবিকভাবে দেখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ।
তাহলে এত আলোচনা কেন?
প্রথম কারণ, তাঁরা দুজনই অত্যন্ত পরিচিত মুখ। ডা. সুষমা রেজার ফেসবুক অনুসারী প্রায় ৭৯ হাজার, আর ডা. কুশলের অনুসারী ৫৪ হাজারের বেশি। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য, মানসিক স্বাস্থ্য, প্যারেন্টিং এবং সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছেন।
দ্বিতীয়ত, তাঁরা নিজেদের পারিবারিক জীবনের অনেকটাই প্রকাশ্যে ভাগ করে নিয়েছেন। অসংখ্য মানুষের কাছে তাঁরা ছিলেন "আদর্শ দম্পতি"। ফলে তাঁদের বিচ্ছেদ অনেকের কাছে কেবল একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয়, বরং একটি আদর্শের ভেঙে পড়া।
তৃতীয়ত, তাঁরা কেবল চিকিৎসক নন, সম্পর্ক নিয়েও পরামর্শ দিতেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, যাঁরা অন্যদের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন, তাঁদের নিজেদের সম্পর্ক টিকল না কেন?
আসলে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন কোনো পরীক্ষাগার নয়, যেখানে সব তত্ত্ব হুবহু কাজ করবে।
মনোবিজ্ঞানীরা বরাবরই বলেন, দাম্পত্য সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। এখানে ব্যক্তিত্ব, সময়, অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা, মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক প্রেক্ষাপটসহ অসংখ্য বিষয় কাজ করে। কোনো পেশাগত জ্ঞান কাউকে সম্পর্ক ভাঙার সম্ভাবনা থেকে শতভাগ মুক্ত রাখতে পারে না।
আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক ধরনের একতরফা আবেগী সম্পর্ক তৈরি করে, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ বলা হয়। আমরা নিয়মিত কারও ভিডিও দেখি, লেখা পড়ি, তাঁর পরিবারের ছবি দেখি। ধীরে ধীরে মনে হয়, তাঁকে আমরা চিনি। তাঁর সুখে খুশি হই, দুঃখে কষ্ট পাই, ভুল করলে রাগ করি।
বাস্তবে তিনি আমাদের চেনেন না, কিন্তু আমরা তাঁকে নিজের পরিচিত মানুষ বলে ভাবতে শুরু করি।
তাই তাঁর জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন এলে সেটিকে ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে নয়, বরং নিজের বিশ্বাসের অংশ হিসেবে বিচার করি। সেখান থেকেই জন্ম নেয় আবেগ, সমালোচনা, হতাশা, কখনো বা নির্মম ট্রল।
সবশেষে একটা কথাই মনে হয়।
বিয়ে যেমন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, বিচ্ছেদও তেমনই ব্যক্তিগত। একটি সম্পর্ক কেন শুরু হয়েছিল, কেন শেষ হলো, সেই সম্পূর্ণ গল্প কেবল সেই দুই মানুষই জানেন। বিয়ে করা, বাচ্চা নেওয়া এ সব সিদ্ধান্তই ব্যক্তিগত। বিয়ে বিচ্ছেদ হওয়া মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়, নতুন জীবনের শুরুও হতে পারে। সংসার টেকানোর দায়িত্ব শুধু নারীর নয়, এখানে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসই বড় কথা। বিনা প্রশ্নে স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি অনুগত থাকাও কোনো কাজের কথা হতে পারে। এসব থেকে সম্পর্কে বিষাক্ততার শুরু।
আশা করি, ডা কুশাল ও ডা সুষমা ও তাঁদের পক্ষে-বিপক্ষে সবাই এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাববেন।







