ডিএনএ নমুনা থেকে কীভাবে শনাক্ত করা যায় ব্যক্তির পরিচয়?

নেত্রকোনায় ১১ বছরের শিশু ধর্ষণের পর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় বারবার ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখে অপরাধীকে শনাক্ত করার কথা বলা হচ্ছে।
এ নিয়ে সমাজমাধ্যম দুই ভাগে বিভক্ত। একটি পক্ষ শিশুটির অভিযোগ মেনে নিয়েছেন। তাঁরা ধরে নিয়েছেন, মাদ্রাসা শিক্ষকই অপরাধী। অন্যদিকে অপরপক্ষ মাদ্রাসা শিক্ষকের কথার ওপর ভিত্তি করে বলছেন, শিশুটির অনাগত সন্তানের বাবা আসলে তার আপন নানা। ডিএনএ নমুনা মিলিয়েই নাকি এই প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে আজ মামলায় কৌঁশুলি বলেছেন, শিশুটির অনাগত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে এ ব্যাপারে কিছুই বলা যাবে না। সে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সন্দেহভাজনের জৈবিক নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে প্রকৃত অপরাধী কে।
ডিএনএ কি? এই নমুনা দিয়ে কী করে শনাক্ত হবে অপরাধীর পরিচয় এ নিয়ে রোকেয়া কালেকটিভের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অফ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড আবু আশফাকুর সজীব।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরিফ হোসাইন।
ডিএনএ কি?
ডিএনএ হচ্ছে একটা বায়োমলিকিউল, একটা পলিমার; যে জায়গায় অনেকগুলো নিউক্লিওটাইড বিভিন্নভাবে একটার সাথে একটা জোড়া লেগে অনেক বড় একটা মলিকিউল তৈরি করে।
সহজ করে বলতে গেলে ডিএনএ এ হলো আমাদের শরীর সম্পর্কিত একটি বই, যেখানে সব তথ্য জমা থাকে। ডিএনএর আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো এটা ব্যক্তিভেদে আলাদা হয়। আমাদের যেমন হাতের আঙুলের ছাপ একজন থেকে আরেকজন আলাদা, ডিএনএর বেলাতেও তাই। বেশিরভাগটুকু মিলে গেলেও, কিছু জায়গায় আলাদা থাকবেই। আইডেন্টিক্যাল টুইনের (একই রকম চেহারার যমজ) রা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।
ডিএনএ নমুনা কী
ডিএনএ নমুনা হলো শরীর থেকে নেওয়া কোনো জৈবিক নমুনা, যেখান থেকে ডিএনএ বের করা যায়। যেমন: রক্ত, লালা, চুল,
ত্বকের কোষ, বীর্য।এসব নমুনা থেকে ল্যাবে ডিএনএ বের করে পরীক্ষা করা হয়।
ধর্ষণের ঘটনা শনাক্তে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ডিএনএ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। ধর্ষণের ঘটনায় ভিকটিমের শরীর বা কাপড়ে যদি অভিযুক্ত ব্যক্তির শরীরের কোনো জৈবিক নমুনা (যেমন বীর্য, রক্ত, চুল ইত্যাদি) পাওয়া যায়, তাহলে সেখান থেকে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। আগেই বলেছি একই চেহারার যমজ ছাড়া একজন ব্যক্তির সঙ্গে অন্য একজনের ডিএনএর মিল পাওয়া যায় না। তাই সংগৃহীত নমুনা সন্দেহভাজন ব্যক্তির ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। যদি মিল পাওয়া যায়, তাহলে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝা যায় যে ওই ব্যক্তি ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তবে সঠিক ফল পাওয়ার জন্য নমুনা ঠিকভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা খুব জরুরি।
পিতৃপরিচয় নির্ধারণে কীভাবে ডিএনএ
নমুনা সংগ্রহ করতে হয়
যদি এরকম হয় যে একজন সন্দেহভাজন আছেন, যিনি অনেক আগে বাবা হয়েছেন, অস্বীকার করছেন; তখন সেক্ষেত্রে সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছ থেকে রক্ত বা অন্য যেকোনো জৈবিক নমুনা (লালা, চুল, ত্বকের কোষ, বীর্য) বা যেকোনো কিছু থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। যিনি মা তাঁর কাছ থেকে আর সন্তানের কাছ থেকে নেওয়া যেতে পারে। এই তিনজনেরটা নিলেই যথেষ্টএনাফ। কিন্তু যদি এরকম হয় যে বাবা নেই এই মুহূর্তে, সেক্ষেত্রে সন্দেহভাজনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করলেও কিছুটা ধারণা পাওয়া সম্ভব যে উনি আসলে বাবা ছিলেন কিনা।
যদি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তবে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে যদি এমন কোনো নমুনা সংগ্রহ করা যায় যেখানে মিক্সড ডিএনএ আছে (অর্থাৎ ধর্ষণের পরে) সেটার মধ্যেও ওই সন্দেহভাজনের ডিএনএ থাকার কথা। সেই প্রোফাইলের সঙ্গে যিনি সন্দেহভাজন তাঁর নমুনা নিয়ে প্রোফাইলিং করলেই সত্যমিথ্যা জানা যাবে।
বাবা - মা - শিশু তিন পৃথক স্বত্ত্বা, সেক্ষেত্রে ডিএনএ মেলে কীভাবে
একটি শিশু তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে দুই সেট ক্রোমোজোম উত্তরাধিকারসূত্রে পায়—এক সেট মায়ের কাছ থেকে এবং অন্য সেট বাবার কাছ থেকে। শিশুর ডিএনএ প্রোফাইলের ৫০% মায়ের সঙ্গে এবং বাকি ৫০% বাবার সঙ্গে মিলে যায়। তাই সম্পূর্ণভাবে শিশুর ডিএনএ না মায়ের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে, না বাবার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে—বরং এটি দুজনের জিনগত বৈশিষ্ট্যের একটি স্বতন্ত্র সমন্বয়।
গর্ভস্থ শিশুর ডিএনএ পরীক্ষা করা যায়?
করা যায় তবে কিছু বিধিনিষেধ আছে।। নমুনা সংগ্রহের সময় গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তবে অন্য নমুনার মতো চাইলেই গর্ভস্থ শিশুর ডিএনএ করে ফেলা যায় না।
ডিএনএ টেস্টের ফলাফল কত দিনের মধ্যে পাওয়া যায়
নমুনা সংগ্রহের পর এক থেকে দুই দিনের মধ্যে পাওয়ার কথা। কিন্তু আমার জানা মতে, আমাদের যেই ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবগুলো আছে সেখানে লোকবল কম। আর পুরো বাংলাদেশে দুটো মাত্র ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাব আছে। একটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের আর অন্যটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের। যেহেতু ওদের কাজ অনেক বেশি, সেই তুলনায় লোকবল কম, সেক্ষেত্রে হয়তো একটু সময় লাগে। কিন্তু থিওরিটিক্যালি যদি বলি, যেই কাজগুলো করতে হয়— ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, পিসিআর করা, তারপর অ্যানালাইসিস কররে রিপোর্ট তৈরি করা - সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ দুই দিনের কাজ। চাইলে একদিনেও করে ফেলা সম্ভব।







