নারী উন্নয়নে নতুন প্রতিষ্ঠান নয়, জবাবদিহিতে জোর দিয়েছিল কমিশন

প্রথম পর্বে নারী সংস্কার কমিশনের সংবিধান, আইন ও নারীর অধিকার–সংক্রান্ত সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছিল। এবার থাকছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নীতিকাঠামো এবং নারী উন্নয়নে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং এসব প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা দূর করতে কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশ।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে নারী উন্নয়ন ও নারী-পুরুষ সমতা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন আইন, নীতি, কর্মসূচি এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এসব উদ্যোগের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন অধিদপ্তর, সংস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আইনি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের নানা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তবে নারী সংস্কার কমিশনের মতে, এতগুলো প্রতিষ্ঠান ও কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
এর কারণ হিসেবে কমিশন বলেছে, একাধিক প্রতিষ্ঠানের একই কাজ, দুর্বল সমন্বয়, সীমিত জনবল, পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব এবং কার্যকর জবাবদিহির ঘাটতি এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তুলতে কমিশন বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুপারিশ করেছিল।
নারী উন্নয়নে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোঃ নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সরকারের নারী উন্নয়ন কার্যক্রমের মূল সমন্বয়কারী। এর অধীনে মাঠপর্যায়ে নারী বিষয়ক অধিদপ্তর নারীদের প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ, কর্মসংস্থান, আইনি সহায়তা এবং ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের সহায়তা প্রদান করে।
জাতীয় মহিলা সংস্থা নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ, কর্মজীবী নারী হোস্টেল, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং নির্যাতিত নারীদের সহায়তা দেয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুদের সৃজনশীল বিকাশ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারিক প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য রয়েছে ডিএনএ পরীক্ষাগার ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, যা ফরেনসিক তদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা এবং নিখোঁজ নারী ও শিশু শনাক্তে কাজ করে।
এ ছাড়া মা ও শিশু ভাতা, ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের জন্য ভাতা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ও নীতিকাঠামোঃ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW), বেইজিং প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশন, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDGs) এবং পালের্মো প্রোটোকলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির অংশীদার।
সেইসাথে রয়েছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, নারী উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কর্মপরিকল্পনা এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ কর্মপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন নীতিকাঠামো।
এ ছাড়া সরকার জেন্ডার-সংবেদনশীল পরিকল্পনা, জেন্ডার বাজেটিং এবং নারী-পুরুষভিত্তিক পরিসংখ্যান সংগ্রহের মতো ব্যবস্থাও চালু করেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৪টি মন্ত্রণালয় জেন্ডার-সংবেদনশীল বাজেট ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।
ঘাটতি যেখানে: কমিশনের পর্যবেক্ষণে, নারী উন্নয়নবিষয়ক কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সরকারের সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হলেও পর্যাপ্ত বাজেট, জনবল এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অভাব রয়েছে।
জাতীয় নারী ও শিশু উন্নয়ন পরিষদ উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সংস্থা হলেও ২০১৫ সালের পর এর কোনো সভা হয়নি। আবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নারী উন্নয়ন বিষয়ক ফোকাল পয়েন্টগুলোর কার্যক্রমও নিয়মিত সমন্বয়ের অভাবে কার্যকর নয়।
কমিশন আরও বলেছে, নারী বিষয়ক অধিদপ্তর ও জাতীয় মহিলা সংস্থার অনেক কর্মসূচি একই ধরনের। প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, আইনি সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষায় দুই প্রতিষ্ঠানের কাজের মধ্যে পুনরাবৃত্তি রয়েছে। একইভাবে অঙ্গনা বিপণন কেন্দ্র এবং জয়িতা ফাউন্ডেশন দুটোই নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বাজারজাতকরণে সহায়তা দেয়, যা সম্পদের অপচয় ও সমন্বয়ের অভাব তৈরি করছে।
ডিএনএ পরীক্ষাগারের ক্ষেত্রেও কমিশন জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, নমুনা সংগ্রহ থেকে প্রতিবেদন প্রস্তুত পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লাগায় বিচার প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়।
পরিকল্পনা ও বাজেট ব্যবস্থার সমস্যাঃ কমিশনের মতে, জেন্ডার-সংবেদনশীল পরিকল্পনা ও বাজেটিং চালু থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। প্রকল্প প্রস্তাবে নারী উন্নয়ন বিষয়ে সাধারণ বিবরণ যুক্ত করা হলেও নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সূচক বা ফলাফল অনেক সময় উল্লেখ থাকে না। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়নেও নারী-পুরুষ সমতা বাধ্যতামূলক সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত নয়।
একইভাবে জেন্ডার বাজেটের অর্থ অনেক সময় অন্য খাতে স্থানান্তর করা হয়। কত খরচ হচ্ছে তার ওপর কার্যকর নজরদারি নেই। নারী-পুরুষভিত্তিক নির্ভরযোগ্য উপাত্তের অভাবের কারণেও বাজেট পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হয় বলে কমিশন উল্লেখ করেছে।
কমিশনের সুপারিশঃ কমিশন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে 'নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়' করা, মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধি পুনর্নির্ধারণ এবং নারী ও শিশু বিষয়ে পৃথক দুটি উইং গঠনের সুপারিশ করে।
আর একইসঙ্গে পলিসি লিডারশিপ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ইউনিট (PLAU)-এর সক্ষমতা বাড়ানো এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশন জাতীয় মহিলা সংস্থা বিলুপ্ত করে এর কার্যক্রম নারী বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি নারী বিষয়ক অধিদপ্তর পুনর্গঠন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব স্পষ্ট করা এবং ডিএনএ পরীক্ষাগারে প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধির কথা বলেছে।
এ ছাড়া প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে নারী-পুরুষ সমতা বিষয়ক পৃথক সেল গঠন, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে (APA) জেন্ডার সূচক অন্তর্ভুক্ত করা, জেন্ডার বাজেটের ব্যয় ট্র্যাকিং চালু করা এবং পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে (IMED) জেন্ডার সেল গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে কমিশনের প্রতিবেদনে।
পরিসংখ্যান ব্যবস্থার উন্নয়নে নারী-পুরুষভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ সম্প্রসারণ, অবৈতনিক পরিচর্যা, অনানুষ্ঠানিক শ্রম ও নারীর প্রতি সহিংসতাবিষয়ক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং বয়স, প্রতিবন্ধিতা ও ভৌগোলিক অবস্থানভিত্তিক উপাত্ত সংগ্রহের ওপরও জোর দিয়েছে কমিশন।
কমিশনের মতে, নারী উন্নয়নের জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব স্পষ্ট করা, পুনরাবৃত্তি কমানো, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠাই হবে টেকসই সংস্কারের প্রধান ভিত্তি।
অভিন্ন পারিবারিক আইন কেন? যৌনকর্মকে সত্যিই কমিশন পেশার স্বীকৃতি দিতে বলেছিল?






