পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন: আত্মহত্যা বা হত্যায় প্ররোচিত করতে পারে মাকে

সি-সেকশনসহ দুইদফা অস্ত্রপচারের মাধ্যমে মা হন সোমা ইসলাম। উচ্চ রক্তচাপ, শরীরে কাঁটাছেড়ার ধকল নিয়ে তাঁকে ঘরের সব কাজ করতে হয়। আবার রাত জেগে একা হাতে বাচ্চা পালতে হয়। এ সময় তিনি খুব ক্লান্ত থাকতেন। পাশাপাশি একাকী ও অসহায়বোধ করতেন। কষ্টে-দু:খ-হতাশায় তখন সোমা ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার পরিকল্পনাও করেন।
বেসরকারি চাকরিজীবী সোমা ইসলাম (৩৫) বলেন, দুইঘন্টা পরপর বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে কখনো টানা ঘুম হয় নি। সকালে অফিসের 'অজুহাতে' স্বামী রাতে আলাদা ঘরে ঘুমাতেন। বাসায় কোনো যত্ন পাইনি। শরীর-মন জুড়ে এতো অবসাদ ছিলো যে, কখনো নিজেকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে হতো, কখনো বা সন্তানকে। এ সময় সোমা কোনো ধরনের চিকিৎসা নেননি।
রংপুরের তারাগঞ্জে গত ১৫ সেপ্টেম্বর এক মায়ের হাতে তার শিশুকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পাঁচমাস বয়সী মেয়ে শিশুটি কান্নাকাটি করলে মা গলা কেটে হত্যা করেন। এরপর শিশুটির রক্তাক্ত মরদেহ স্বামীর হাতে তুলে দেন। ওই মায়ের স্বজন ও পুলিশ বলেছেন, তিনি মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন।
মাতৃত্ব অপার আনন্দের ঘটনা। তবে সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে মায়েদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পোস্টপারটাম ডিপ্রেশনে (প্রসবোত্তর বিষন্নতা) আক্রান্ত হন। সচেতনতার অভাবে আক্রান্ত অনেক মা চিকিৎসার বাইরে থাকেন। ‘মানুষ কী ভাববে’ এবং শ্বশুরবাড়িতে নিজের ভাবমূর্তি হারানোর ভয়েও অনেকে চিকিৎসা নেন না। এতে মায়ের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু, জীবন হুমকিতে পড়ে। অনেকে আবার চিকিৎসা নিলেও মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসাকে এড়িয়ে চলেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এম এ সালাহ্উদ্দিন কাউসার রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন, সাধারণ রোগের উপসর্গের সাথে মিল থাকায় অনেক সময় পরিবার পোস্টপারটাম ডিপ্রেশনের উপসর্গকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে না। নতুন মায়েদের এসব ‘একটু-আধটু সমস্যা’ স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়। মাকে সুস্থ রাখতে একটা পর্যায়ে এলে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।
তিনি আরও বলের, নতুন মায়ের যদি অতীতে মানসিক রোগের ইতিহাস থাকে বা চিকিৎসা চলে, তবে তা গর্ভধারণের শুরু থেকেই আমলে নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে চিকিৎসা ভালো ফলাফল নিয়ে আসে।
পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন হলে কী হয়:
চিকিৎসকেরা বলছেন, সন্তান প্রসবের পরে মায়েরা ৫ ধরনের বিষন্নতায় আক্রান্ত হন। বিষন্নতা দীর্ঘমেয়াদী হলে তাকে পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন (প্রসবোত্তর বিষন্নতা) বলা হয়। পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন সন্তান প্রসবের তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সাধারণত হয়ে থাকে। যা এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। কারো ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় ধরে থাকতে পারে।
পোস্ট পারটাম ডিপ্রেশনে আক্রান্ত মায়েরা নানান মানসিক চাপ, অবসাদ, ক্লান্তি, উদ্বেগে ভোগেন। তাদের কিছুই ভালো লাগে না, ঘুম আসে না, মেজাজ খিটখিটে থাকে, সব কাজে বিরক্ত আসে। কেউ কেউ আবার সারাক্ষণ কান্নাকাটি করেন, সামান্য বিষয় নিয়ে প্রচন্ড রাগারাগি করেন, হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে, মরে যেতে ইচ্ছে করে। কখনওবা সন্তানকে সহ্য করতে পারেন না, মারধর করেন। তিনি নিজের ও সন্তানের যত্নসহ দৈনন্দিন কাজকর্ম ঠিকঠাক করতে পারেন না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মদানের পর ১৩ শতাংশ নতুন মা পোস্টপারটাম ডিপ্রেশনে ভোগেন। বাংলাদেশে এই হার অনেক বেশি, ৩৯.১ শতাংশ। ‘হাউ টু ডিল উইথ পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন অ্যান্ড ডমেস্টিক ভায়োলেন্স’ শীর্ষক এক সেমিনারে এই তথ্য দেওয়া হয়। সাইকিউর অরগানাইজেশন, মম ফর মম, ফাউন্ডেশন ফর ল এন্ড ডেভলপমেন্টের যৌথ উদ্যোগে এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
প্রতিবেদনটি তৈরি করতে ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মায়েদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্তান জন্মের পর অনেকেই বিষণ্নতায় ভুগেছেন। তাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক চিকিৎসা নিয়েছেন, একজন এখনো চিকিৎসাধীন। তবে অধিকাংশ মায়েরই পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না।
টাঙ্গাইলের ময়না আক্তার ঢাকায় বাসা-বাড়িতে কাজ করেন। ৩২ বছর বয়সী এ নারীর তিন সন্তান। পাঁচ বছর আগে ছোট মেয়ের জন্মের সময় জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছে। তার কাছে পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘হেইডা আবার কী। এতো-সেতো বুঝিনা ‘ তখন এর উপসর্গ জানানো হলে উত্তরে তিনি বলেন, ‘পোলাপানডি ছোডো থাকতে সবসময় রাগ লাগতো। কষ্টও হইতো। ভয়ে স্বামীরে কিছু কই নাই। তয় পোলাপানডিরে অনেক পিডাইছি।’
আইসিডিডিআরবির ‘এনহ্যানসিং অ্যাক্সেস টু মেন্টাল হেলথ সার্ভিস থ্রু টেলিমেডিসিন হেলথ সার্ভিস অ্যাট ওয়েলবিয়িং সেন্টার ইন বাংলাদেশ ’শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের অন্ত:সত্ত্বা এবং সন্তান জন্মদানের পরে ৭৭ শতাংশ নারী বিষন্নতা কিংবা উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হন। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশ মায়েদের মধ্যে দুটো সমস্যাই থাকে। এ গবেষণার আওতায় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরে জুলাই পর্যন্ত সাতটি জেলা ও উপজেলায় সাড়ে সাত হাজার নারীকে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন কেন হয়:
প্রসবের পরে একজন মায়ের শরীরে হরমোনের মাত্রার নানা ধরনের উঠা-নামা হয়, ফলে তারা শারীরিক-মানসিকভাবে অনেকটা ভঙ্গুর অবস্থায় থাকেন। এর পাশাপাশি ঘুম-বিশ্রাম-পর্যাপ্ত সুষম খাবারে ঘাটতি, অসুস্থ সন্তান জন্মদান, মায়েদের প্রতি পরিবারের যত্ন বা মনোযোগের অভাব, পূর্ববর্তী মানসিক রোগের ইতিহাস, চাকরিসহ আর্থিক চাপ, শারীরিক গঠনে পরিবর্তন মেনে নিতে না পারা, অন্যতম বড় কারণ। মায়েরা হতাশায় ভুগে জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। সন্তানকে মারধর করেন বা প্রয়োজনীয় যত্ন করেন না। বিষন্নতার মাত্রা বেশি হয়ে গেলে অনেক সময় নিজে আত্মহত্যা করেন বা সন্তানকে মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন, চিকিৎসা নিলে অল্প সময়ের মধ্যেই ডিপ্রেশনে ভোগা মায়েরা সুস্থ হয়ে ওঠেন। আত্মহত্যা প্রবণ বা বেশি অসুস্থ মায়েদের ক্ষেত্রে চিকিতসার সময় কিছুটা লম্বা হতে পারে। এ সময় রোগীকে প্রয়োজনমতো ফলোআপে নিয়ে আসা জরুরি। পাশাপাশি ঘরে সহায়ক ও আনন্দদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবার সহযোগী হলে মায়েদের ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হওয়ার হার কমে যায়। আবার আক্রান্ত হলেও দ্রত সেরে ওঠেন। গণমাধ্যমকর্মী ফারজানা পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন নিয়ে সচেতন ছিলেন। তিনি মা হবার পরে চিনি, ক্যাফেইনসহ খাবার নিয়ন্ত্রণ করেছেন, ইয়োগা করেছেন। স্বামীও বেশ সহযোগিতা করেছেন। স্ত্রীকে দু-একদিন পরপরই বাইরে নিয়ে যেতেন। স্ত্রীর সাথে রাত জেগে সন্তান পালন করতেন।
মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে যেতে অনীহা:
ঘুম না হওয়া, বুক ধরফর, অস্থিরতা, মাথাব্যথাসহ পোস্টপারটাম ডিপ্রেশনের অনেকগুলো উপসর্গই সাধারণ রোগের মতো শারীরিক। উপসর্গ দেখে বোঝা যায় না তারা বিষন্নতায় ভুগছেন। এসব উপসর্গ নিয়ে রোগীরা সাধারণত গাইনি বা মেডিসিনের চিকিৎসকের কাছে যান। রোগের উপসর্গ বেশি মাত্রায় প্রকাশের আগে পরিবারও মনোরোগ বিষয়ক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে চান না।
প্রায় তিন দশক ধরে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিষয়ে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত আছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধক্ষ্য নাহ্রীন আখতার। এই অধ্যাপক বলেন, ফলো আপে মায়েরা এলে তাদের মধ্যে বিষন্নতার উপসর্গ দেখলে মানসিক চিকিৎসকের কাছে যেতে বলি। তখন সমাজের ভয়ে বিশেষ করে শ্বশুরবাড়ি কী মনে করবে চিন্তা করে বলেন, ‘ম্যাডাম, আপনিই একটু লিখে দেন।’
শারীরিক জটিলতায় ৩৪ বছর বয়সী এক নারী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন নি। সন্তান পালতে গিয়ে চাকরি ছেড়েছেন। দেড় বছর আগে জন্মের সময় বাচ্চার ওজনও কম ছিলো। এ নিয়ে তিনি স্বজনদের কাছে নানান কটু কথা শুনেছেন। তিনি গত এক বছর ধরে পোস্টপারটাম ডিপ্রেশনে ভুগছেন। রোগটি সম্পর্কে তার ধারণা থাকার পরেও ‘এখন পাগলের ডাক্তারের কাছে যেতে হয়েছে’ বলে শাশুড়ি-জায়ের খোঁটার ভয়ে সম্প্রতি তিনি মেডিসিন বিষয়ক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন।
পরিচয় না প্রকাশের শর্তে এই নারী বলেন, ‘মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে গেলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন উঠতে-বসতে খোঁটা দেবে, তার চেয়ে ডিপ্রেশনে ভোগা ভালো।’
পোস্টপারটাম ডিপ্রেশনের রোগীদের এই টানাপোড়ন সম্পর্কে অবগত আছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানভীর ইসলাম। এই অধ্যাপক বলেন, পোস্টপারটাম ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়ে অনেক রোগী আসেন।
বেশিরভাগ সময় তাদের মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে রেফার করলেও যেতে চান না। পরিবারও চিকিৎসা দেওয়ার অনুরোধ করে। তখন বাধ্য হয়ে চিকিৎসা দিতে হয়। তবে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের-স্বজনদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে মনোরোগ চিকিৎসকদের কাছে পাঠান বলে জানান তিনি।
তবে মনোরোগ চিকিৎসকদের কেউ কেউ বলছেন, শারীরিক উপসর্গের কারণে ফলোআপে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে রেফার করার ক্ষেত্রে এক ধরনের ঘাটতি বা অনিচ্ছা রয়েছে। এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে এ সমস্যা সমাধানে প্রসূতি সেবায় মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিংয়ে আনার পরামর্শ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
চিকিৎসায় ভালো হয়:
আগের তুলনায় আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার হার বাড়ছে। পরিবারগুলোও কিছুটা সচেতন হয়েছে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে ইউটিউব চ্যানেলের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। সেবা নিয়ে ভালো হয়ে যাওয়া রোগীদের মাধ্যমেও অনেকে চিকিৎসকের কাছে আসেন।
৩৮ বছর বয়সী তানজিয়া আক্তার দুই সন্তানের মা। প্রথম সন্তান জন্মের পরে ছোটখাট বিষয়ে তুলুমকান্ড বাঁধিয়ে ফেলতেন, কান্নাকাটি করতেন, রাগারাগি করতেন। কখনওবা জিনিসপত্র ভাঙচুর করতেন। এমনকি কয়েকবার ছোট সন্তানকে মারধরও করেছেন। এভাবে আড়াই বছর চলার পরে তিনি শুরুতে মেডিসিনের চিকিৎসকের কাছে যান। পরে ওই চিকিৎসকের পরামর্শে মানসিক চিকিৎসা শুরু করেন। এখন তিনি ভালো আছেন। তার এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি চিকিৎসা শুরু করেন। যিনি চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। ওই বন্ধু ইউটিউবে পোস্টপারটাম নিয়ে একটি ভিডিও দেখার পরে চিকিৎসা নিয়েছিলেন।







