সিডিআই (উচ্চারণ অযোগ্য): ছিঁড়ে ফেলা/কেটে ফেলার হুমকি দেওয়ার আগে ভাবুন

রোকেয়া কালেকটিভ  মতামত
সিডিআই (উচ্চারণ অযোগ্য): ছিঁড়ে ফেলা/কেটে ফেলার হুমকি দেওয়ার আগে ভাবুন
ছবি: রোকেয়া কালেকটিভ গ্রাফিক্স

সন্তান হলো নাড়ি-ছেঁড়া ধন। মায়ের গর্ভফুলের সঙ্গে এই নাড়িই ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগ পর্যন্ত সন্তানকে যুক্ত করে রাখে। জন্মানোর পর তার নাড়ি কাটা হয়, সে হয় এক পৃথক সত্তা। আচ্ছা, পৃথক সত্তা হলেও আদতে কি সে কখনও মায়ের থেকে পৃথক হতে পারে? যদি পারতই, তাহলে রায়েরবাজারের গণকবরের যে প্রান্তে দাঁড়িয়ে মা কাঁদতেন, সেখান থেকেই তাঁর গুলিবিদ্ধ ছেলেটির মরদেহ শনাক্ত হলো কী করে? কেন পতাকা কপালে জড়িয়ে একাদশ শ্রেণির নাফিস কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে যাওয়ার পরই মায়ের বুকটা খামচে ধরেছিল তীব্র শঙ্কা? ওই রাতেই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের লাশঘরে নাফিসকে খুঁজে পেয়েছিলেন মা। পিঠের দিকটা রক্তে ভিজে গিয়েছিল। কেন এখনও নারায়ণগঞ্জের নিহত ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপের মা বাড়ির বাইরে এক পা-ও ফেলেন না? কেন এই ভ্রান্তিতে আছেন যে তিনি না থাকলে রিয়া তাঁকে খুঁজে না পেয়ে একেবারে চলে যাবে? রিয়া তো আর কখনও ফিরবে না!

২০২৪ সালের যে গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন হয়, সেই অভ্যুত্থানকে ষড়যন্ত্র বলতে পছন্দ করে একটি পক্ষ। দুই বছর পরও তারা অঙ্ক কষে। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন দেখে, মেটিকুলাস ডিজাইন দেখে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কারণে যাদের মনে দগদগে ক্ষত, তাদের কারসাজি দেখে, দেশি-বিদেশি দোসরদের সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়। এ কথা তো বইপত্রেই আছে, সিআইএ কীভাবে দেশে দেশে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। গুয়াতেমালায় মার্কিন ফল কোম্পানি ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির ব্যবসায় ঝামেলা হওয়ায় ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার জনপ্রিয় সরকারকে সিআইএ ফেলে দিয়েছিল। কয়েক দশক আগে ইরাকে আর সম্প্রতি ইরানে কী হলো, তাও কারও অজানা নয়। আর এসব কথা অসত্য হলে ট্রাম্প প্রশাসন এসেই এই ঘোষণা দিত না যে তারা আর রেজিম চেঞ্জের খেলায় নেই। মুসলিম ব্রাদারহুডের হাতে আরব স্প্রিংয়ের সুফল ছিনতাই হয়েছে, এমন যুক্তিও পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা যায় না। হ্যাঁ, বাংলাদেশেও ক্ষত আছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আর তাদের ভাবাদর্শে উজ্জীবিত তরুণদের একাংশের। কিন্তু তাই বলে গণ-অভ্যুত্থান মিথ্যে হয়ে যায় না।

উন্নয়নের স্মারক ঢাকা শহরের ফ্লাইওভারের নিচে শত শত ছেলে পুলিশের গুলিতে প্রাণ গেছে, এই কথা কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে কখনও? কিংবা গাড়িভর্তি লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা? ১৭ বছরের সেই কিশোর, যে বিজিবি সদস্যের গুলির আঘাত থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়তে পড়তে একসময় নিস্তেজ হয়ে মারা গেল? কেউ কি কখনও বলতে পারবে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেনি? শেখ হাসিনা, যিনি নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মানুষকে এটা-ওটা খাওয়ার পরামর্শ দিতেন ঠাট্টাচ্ছলে, সেই তিনিই হাসতে হাসতে বলেছিলেন, তাঁর পিয়ন চারশ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। তাঁর পতনের আগেই এস আলমের ব্যাংক দখল আর হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের খবর এ দেশেরই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। অংশগ্রহণমূলক ভোট হয়নি। বারবার বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস। গুমের শিকার হয়েছেন অজস্র মানুষ। চিরতরে হারিয়ে গেছেন তাঁরা। আমরা এত আত্মবিস্মৃত হই কী করে?

যে ছেলেরা এই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল, তারা অন্তত দুটি আন্দোলনে অংশ নিয়েছে স্কুল-কলেজের পোশাক গায়ে, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন আর কোটা সংস্কার আন্দোলন। অভ্যুত্থান এসেছে এরই পথ ধরে।

সত্য, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মোহভঙ্গ হয়েছে অনেকের। শুরুতেই একদল মুক্তিযুদ্ধকে ২৪-এর মুখোমুখি দাঁড় করানোর খেলায় মেতেছে। কেউ উপদেষ্টা হয়েছেন, কেউ পেয়েছেন অসীম ক্ষমতা, কেউ সুযোগ বুঝে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে আগুন দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে হামলা করেছেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ভাস্কর্য ভেঙেছেন, কেউ মানুষ পিটিয়ে মেরেছেন, আর কেউ কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দিয়েছেন। কেউ কাওয়ালি চাপিয়ে দিয়েছেন বাউল গানের ওপর, কেউ মেয়েদের ফুটবল খেলা পণ্ড করেছেন।

কিন্তু কেউ কি বলতে পারবে, সন্তানহারা কোনো মা এসব কাজে যুক্ত ছিলেন বা উসকানি দিয়েছেন? তাঁরা গণভবন লুট করতে গেছেন? পতিত স্বৈরাচারের অন্তর্বাস নিয়ে উল্লাস করেছেন? তাঁদের বুক তো খাঁ খাঁ করে, তাঁদের কান্না যাবজ্জীবনের।

আলোচিত-সমালোচিত শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন, যাঁর মা আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনের সাংসদ ছিলেন, তিনি যখন উচ্চারণ-অযোগ্য ভাষায় জুলাইকে গালাগাল করেন, তখন আরও অনেকের মতো এই মায়েদের বুকেও বাজে।

সন্তানকে আগলে রাখার বেপরোয়া চেষ্টা সব মায়ের। এই তো সেদিন শাওন বলছিলেন, তাঁর ছেলেটি নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্কুলে যেতে পারেনি। কতই বা বয়স তার? জুলাইয়ে প্রাণ হারানো নাফিস বা আনাসের মতোই। অত্যন্ত বেদনাদায়ক এই খবর। কেন হিংসা ছোঁবে শিশু-কিশোরদের? তাঁর মতোই জুলাইয়ে সন্তান হারানো মায়েরাও তাঁদের ছেলেদের নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ধরে রাখতে পারেননি। চিরতরে সন্তানহারা হয়েছেন।

জুলাইকে ধর্ষণ করার যে হুমকি তিনি হাসতে হাসতে দিলেন, তা সন্তানসম ছেলেমেয়েরা ঠিক কীভাবে নেবে? তারা তো তাদের খেলার সাথিকে হারিয়েছে। তিনি জেনে-বুঝে খুবই সেক্সিস্ট উক্তি করে বসলেন। সমাজে এ ধরনের বুলি মেয়েদের শুধু ঝুঁকিতেই ফেলবে। ফেলছেও। তরুণদের কাছে এখন প্রিয় গালি সিডিআই, উচ্চারণ-অযোগ্য, ‘… ছিঁড়ে ফেলা’, ‘… কেটে ফেলা’। তারা শুধু শাওনের ছবিতে জুতা মেরেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, সেক্সিস্ট গালির বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। অপর পক্ষও থেমে নেই। সমাজে কি এভাবে ভয়ঙ্কর সব অপরাধ স্বাভাবিক করে তোলা হচ্ছে না? যে যোনির সঙ্গে মানবশিশুর জন্মের যোগ, তাকে অসম্মান করে কী বিপদ তাঁরা ডেকে আনছেন, তা কি বুঝতে পারছেন না?