"মুক্তিযুদ্ধ স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ফল, এমন অভূতপূর্ব সময় আর কখনো আসেনি"

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ১৯৭১ সালে গেরিলা বাহিনীর (ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন) পক্ষ থেকে অংশ নিয়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। পেশায় চিকিৎসক ফওজিয়া মোসলেম এক মাসের সন্তান কোলে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছেছিলেন আগরতলায়।
কাজ করেছেন মেডিকেল ক্যাম্পে। চিকিৎসা দিয়েছেন আহত মুক্তিযোদ্ধাসহ সেবাপ্রার্থী বহু মানুষকে। ৫৫ বছর পরও তাঁর কাছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপকতা তাঁর কাছে অসীম।
যুদ্ধদিনের কথা ফওজিয়া মোসলেন বলেছেন রোকেয়া কালেকটিভকে।
২৫ মার্চ রাতভর শহর জুড়ে কেবল গোলাগুলির শব্দ। পরদিন ২৬ মার্চ সকাল থেকেই শহরের রাস্তায়, অলিতে-গলিতে দিশেহারা মানুষের দিগ্বিদিক ছোটাছুটি। রেডিও স্টেশন ঘোরাতে ঘোরাতে ফওজিয়া মোসলেম জানতে পারেন ঢাকায় গণহত্যা হয়েছে।
ফওজিয়া তখন গর্ভবতী। সন্তান জন্মদানের সময় ঘনিয়ে এসেছে। একদিন পরই স্বামী সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক চলে যান যুদ্ধে।
২৭ তারিখ সকালে কারফিউ তুলে নেওয়া হলে ফওজিয়া মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে যান। প্রথমে ডা. ফিরোজা বেগমের ক্লিনিকে গিয়েছিলেন তাঁরা। ওখানেই কাজ করতেন ফওজিয়া। সেখানেও হামলা হতে পারে এই আশঙ্কায় আবারও হাসপাতাল পরিবর্তন। এবার মিটফোর্ডে।
"আশেপাশে ভয়াবহ পরিস্থিতি, সবার মধ্যে তুমুল উত্তেজনা, উদ্বেগ চলছে, কি হচ্ছে, কি হবে এসব নিয়ে, আর আমার তখন একটাই চিন্তা আমার বাচ্চাটা ঠিকমত হবে তো?" ফওজিয়া রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন।
২ এপ্রিল ফওজিয়া একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু এবার? এত ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবেন? তারপরও এপ্রিলের ৫ তারিখ মাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে রওনা দেন তিনি পায়ে হেঁটে। পথে তাঁর ছোট মামির সাথে দেখা হয়, মামাও যুদ্ধে গেছেন।
এরপর ফওজিয়া মোসলেমের পালা।
"মাস খানেক পর কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগিতায় আমিও ঘর ছাড়লাম," তিনি বলেন। এক মাসের শিশুকন্যা নিয়ে আগরতলার ক্র্যাফটস হোস্টেল ক্যাম্পে দায়িত্বে যোগ দিলেন ফওজিয়া মোসলেম।
ফওজিয়া মোসলেমের সঙ্গে আরও দুইজন নারী সহকর্মী ছিলেন।তাঁদের একজনের সঙ্গে ছিল ছয় মাসের শিশু। আর একজন সন্তানসম্ভবা।
“তখন সময়টাই এমন, কেউ নিজেদের কথা, বাচ্চাদের কথা ভাবেনি। সবার মাথায় একটাই চিন্তা, কিভাবে যুদ্ধে শরিক হওয়া যায়, কাজ করা যায়,” তিনি বলেন।
“যুদ্ধে অংশ নিচ্ছি, আলাদা কিছু করছি এই অনুভুতি কাজ করেনি, কারণ তখন সবাই যুদ্ধের সাথে যুক্ত ছিল, আশেপাশের সবাই যুদ্ধের কাজ করেছে, যে যেভাবে পেরেছে।”
আগরতলায় পৌঁছে সেখানকার হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাশোনা করার, ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং ট্রেনিং ফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার কাজ করছিলেন তাঁরা। এছাড়া আগরতলা ও আশেপাশের এলাকায় জনমত সংগ্রহের কাজ ও যুদ্ধের জন্য সাহায্য সংগ্রহের কাজ চলতে থাকে পুরো সময়টায়।
ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত আগরতলায় ছিলেন ফওজিয়া মোসলেম। ঢাকায় থেকে বিজয় মিছিল করতে না পারার আক্ষেপ তাঁর থেকে যাবে আজীবন।
ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভিত রচিত হয়েছিল আরও আগেই। সেই ১৯৫২ সালে। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, তারপর ৬৬, ৬৯, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। এসবই সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ফল। এমন অভূতপূর্ব সময় আর কখনো আসেনি বলে মনে করেন ফওজিয়া।
“বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম সময় ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়,” তিনি বলেন।
“মুক্তিযুদ্ধ তো আসলে কোন ঘটনা না, এটা সেই সময়ের একটি রাজনৈতিক ধারা, যে ধারার মূলে ছিল– উদার, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং মুক্তবুদ্ধির চিন্তা।”
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফওজিয়া মোসলেমের মত দেশে গেজেটভুক্ত নারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ১ হাজার ১৪৬ জন, এদের মধ্যে আছেন কণ্ঠসৈনিক, চিকিৎসক, সেবিকা ও বীরাঙ্গনা।
গেজেটভুক্ত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বীরাঙ্গনা মাত্র ৪৫৫ জন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাদের সম্মানিত করার ঘোষণা দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান।
ফওজিয়া মোসলেমের জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনে যুক্ত থাকতে না পারা।
রাষ্ট্রপতির আদেশে ১৯৭২ সালে তৈরি হয় বীরাঙ্গনাদের জন্য নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।
“এই কাজের সাথে থাকতে না পারা আমার জন্য দুঃখের এবং লজ্জার,” আক্ষেপ জানান তিনি।
“এখন উপলব্ধি করতে পারি যে সেসময় আমাদের বীরাঙ্গনাদের পাশে থাকাটা কত জরুরী ছিলো, তাঁদের প্রাপ্য সম্মান, মর্যাদা আর অধিকারটুকু আমরা দিতে পারিনি।”
তাঁদের জীবনে অনেক ঝড়-ঝাপটা গেছে। কেউ হয়তো পরিচয় গোপন করে আছেন, বা এতবছর পরে এসে কথা বলছেন, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে তাঁদের যে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা, সেই পরিস্থিতি স্বাধীনতার এতবছর পরেও আমাদের সমাজে তৈরি হয়নি বলে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের ‘ডাক্তার আপা।’
২০০০ সালের দিকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের একটি উদ্যোগে হবিগঞ্জ জেলার প্রান্তিক এলাকার কিছু বীরাঙ্গনার চিকিৎসা কাজের সুযোগ হয় চিকৎসক ফওজিয়া মোসলেমের।
“তাঁদের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিলো...," এ কথা বলতে বলতে ফওজিয়া মোসলেমের গলায় আক্ষেপ ঝরে পড়ে।
ফওজিয়া মোসলেমের মতে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে ছোট করে দেখা, সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারা জাতি হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা, তবে তিনি এখনও আশায় আছেন ইতিবাচক পরিবর্তনের।
“সঠিক ইতিহাস জানার চর্চাটা চালিয়ে রাখতে হবে," তিনি বলেন।
"মুক্তিযুদ্ধের সময়কার রাজনীতির যে ধারা তা দিয়েই মুক্তিযুদ্ধকে টিকিয়ে রাখতে হবে, সেই আখ্যান যেন বদলে না যায়,” ফওজিয়া মোসলেম বলেন।








