আসুন, অন্তত রামিসাদের জন্য এক হই

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
আসুন, অন্তত রামিসাদের জন্য এক হই
ramisa (1)

গত ৪৮ ঘণ্টায় ১৭ কোটি মানুষের বড় অংশ পল্লবীর দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তারের (৭) খুন ও ধ*র্ষণের ঘটনায় আটকে আছেন। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ঘটে গেছে একের পর এক ঘটনা।

রামিসাকে মা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। দরজার বাইরে ছোট্ট পায়ের একজোড়া জুতো দেখেই বুকটা মুচড়ে উঠেছিল তাঁর। তিনি যখন দরজায় বেপরোয়া করাঘাত করে যাচ্ছেন, তখন সন্দেহভাজন খুনি ধ*র্ষণের পর পাখির মতো শরীরটা থেকে ধড় আলাদা করছে।

সেদিন সন্ধ্যায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন সোহেল রানা (৩০) ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬), যিনি স্বামীকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন বলে পুলিশের দাবি।

রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না।আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।”

মেয়েটা বাবার অপেক্ষায় থাকত। বাইরে গেলে একশবার ফোন করত, ফিরে এলে শরবত দিত। বাবার বুক জুড়িয়ে যেত। মেয়ে হারিয়ে বাবা বলেছেন, তাঁর হৃৎপিণ্ড উপড়ে নিয়েছে ঘাতক। শূন্য বুক আর কখনও পূর্ণ হবে না।

ওর জানাজা হয়েছে। মৌলভী সাহেবের কান্না চাপা গলার প্রার্থনায় আসমান কেঁপে উঠেছে। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এরপর কী?

রামিসার বাবা যা বলেছেন, তাই। বিচার চলতে থাকবে। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় শাস্তি দেখে যাবেন, এই নিশ্চয়তা নেই। রামিসার ঘটনায় ধ*র্ষণের পর সাত বছরের শিশু আছিয়া হত্যাকাণ্ডের ইস্যু আবারও আলোচনায়। নিম্ন আদালতে অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। ধারণা করি আরও বহু বহু দিন এই মামলা ঝুলে থাকবে।

আইনের ফাঁক গলে আসামি যে পালিয়ে যাবেন না, তারও নিশ্চয়তা নেই। চকলেটের লোভ দেখিয়ে দিনাজপুরে পাঁচ বছরের শিশুকে ধ*র্ষণের পর যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি জামিন বাগিয়ে নিয়েছিলেন। ব্যাপক আলোচনার মুখে উচ্চ আদালত সেই জামিন স্থগিত করে আসামি গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন।

প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার এই হাল দেখে অনেকে অনেক রকম প্রস্তাব নিয়ে হাজির হচ্ছেন। শরীয়া আইন প্রবর্তনকে সব সমস্যার সমাধান মনে করছেন। এই তালিকায় বাংলাদেশের এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয়, গণতন্ত্র-মুক্তচিন্তার সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও রয়েছেন।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রুপে লিখেছেন, “আমাদের সমাজে এখনও একটা মেয়ে চাইলে হাফ প্যান্ট পরে বাইরে বের হতে পারে। ইসলামী শাসন আসলে মেয়েরা হাফ প্যান্ট পরে বাইরে বের হতে পারবে না, বিষয়টা কিন্তু খুবই সাংঘাতিক। তাই যতদিন জনগণের শাসন কায়েম আছে, যতদিন গণতন্ত্র দিয়ে মানুষের অধিকার সংরক্ষিত হচ্ছে ততদিন এসব ছোটখাটো ভুলত্রুটির দিকে মনোনিবেশ না করাই উত্তম।” তিনি রামিশার কয়েকটি ছবিও জুড়ে দিয়েছেন পোস্টে।

শিশুদের ক্ষেত্রে একেবারে প্রযোজ্য নয় এমন শব্দ ব্যবহার করেও কেউ কেউ পোস্ট দিয়েছেন। এই দল কাছাকাছি সময়ে বনশ্রীর মাদ্রাসায় ধর্ষণের শিকার ছেলে শিশুর মৃত্যু, আরও অন্তত চারটি ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় মুখ খোলেনি।

আরেক দল হতাশ হয়ে সন্দেহভাজন খুনি ও ধ*র্ষককে ছিনিয়ে নিতে থানার সামনে জড়ো হয়েছিল। তারা বিক্ষুব্ধ। তারা জানে এ দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ (‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ গবেষণা, সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগ)।

আর রাজনীতিকরা এই ইস্যুতে যথারীতি রাজনীতি করছেন। তাঁরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছেন। চাইতেই পারেন। সরকার কি কখনও জনসমক্ষে এই তথ্য প্রকাশ করেছে ধর্ষণের, বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় কতজনের সাজা কার্যকর হয়েছে? কেন করে না?

অবাক হই। শিশুদের জন্যও আমরা এক হতে পারি না। ধ*র্ষণ, হত্যার শিকার শিশুর ওপর দোষ চাপাতে আমাদের দ্বিধা হয় না। আর এই ফাঁকে একের পর এক ঘটনা ঘটতেই থাকে। পুলিশের হিসেবে এপ্রিলে নারী-শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে ২০১১টি, মার্চে ছিল ১৪৮৫টি, আর এর আগের মাসে ১১৮১টি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানাচ্ছে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ছয় বছরের নিচে ১৫ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একজন গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। খুন হয়েছে ৩ জন। ৭–১২ বছর বয়সে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪০ শিশু, ৭ জন খুন হয়েছে।

আজ সকালেই ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা গবেষণা প্রতিবেদন পড়ছিলাম। যে শিশুরা এসব ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারছে তাদের অনেকেই ভয়ঙ্কর উদ্বেগ, বিষণ্নতা নিয়ে বড় হবে। কারও কারও দেখা দিতে পারে আচরণগত সমস্যা। অপরাধ তাদের চোখে আর অপরাধ বলে মনে হবে না।

আসুন, এই একটি ইস্যুতে এক হই আমাদের শিশুদের জন্য। যে শিশু ধ*র্ষণের পর খুন হয়েছে, তার কথা ভাবুন। রামিসার বন্ধুদের কথা ভাবুন। যে শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে বলছে রামিসা আগের দিন তাকে একটি আইসক্রিম কিনে দিয়েছিল, তার মুখের দিকে তাকান। নিজেদের দিকে তাকান।