নগদ সহায়তা নয়, জীবিকা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দারিদ্র্য কমাতে কার্যকর: গবেষণা

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে শুধু ভাতা বা নগদ অর্থ সহায়তা যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি জীবিকা উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষায় প্রবেশাধিকার এবং গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন গবেষক, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন (এলএসএইচটিএম) যৌথভাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ মত তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন, সরকারি কর্মকর্তা এবং উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩০ কোটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার। এদের মধ্যে প্রায় ২৪ কোটি প্রতিবন্ধী শিশু মানসম্মত শিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বাধার মুখে রয়েছে। বাংলাদেশেও অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামোর ঘাটতি, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং আর্থিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ কারণে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে কোন ধরনের কর্মসূচি কার্যকর, সে বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ তৈরি জরুরি বলে মনে করেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বলেন, প্রতিবন্ধিতা ও দারিদ্র্যের মধ্যে দ্বিমুখী সম্পর্ক রয়েছে। যেসব পরিবারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন, তাদের জন্য দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসা তুলনামূলকভাবে কঠিন। তাই এই দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে নয়, সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য যে সহায়তার বড় অংশ দেওয়া হয়, তা অনুদাননির্ভর। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু নগদ অর্থ সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন কর্মসূচি, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করবে।
ব্রিটিশ হাইকমিশনের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজার তাহেরা জাবীন বলেন, প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এগিয়ে নিতে গবেষণালব্ধ তথ্যকে নীতিনির্ধারণে কাজে লাগানো জরুরি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার ফলাফল ব্যবহার করে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ব্র্যাকের প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্তিমূলক আল্ট্রা পুওর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। মাথাপিছু মাসিক আয় ও পারিবারিক ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ২১ শতাংশ, কর্মঘণ্টা ২৭ শতাংশ এবং আয় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এভিডেন্স ইন ডিজঅ্যাবিলিটির সহকারী অধ্যাপক ড. মার্ক ক্যারিউ বলেন, গবেষণার ফলাফল দেখাচ্ছে যে, ব্র্যাকের এই কর্মসূচি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দারিদ্র্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে সাইটসেভার্সের ‘শিখবো সবাই’ কর্মসূচি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সহায়তা করছে।
আল্ট্রা পুওর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচির শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ড. মুন্সী সুলাইমান বলেন, একসময় ধারণা ছিল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও নগদ সহায়তাই যথেষ্ট। কিন্তু অভিজ্ঞতা ও গবেষণা বলছে, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নভিত্তিক উদ্যোগও সমান কার্যকর। একই সঙ্গে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশি ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ডিজঅ্যাবিলিটি প্রফেশনালসের সভাপতি ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
এ সময় বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান)-এর সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে প্রতিবন্ধী শিশুরা এখনও পিছিয়ে রয়েছে। উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও মূলধারার বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষণপদ্ধতিতে কতজন শিক্ষক বাস্তবে প্রশিক্ষিত, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, বিশেষায়িত বিদ্যালয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির বদলে পৃথকীকরণকে জোরদার করছে। এসব বিদ্যালয়েও ব্রেইল ও সাংকেতিক ভাষায় দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
জবাবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ নাজমুল আহসান বলেন, সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো অনুসরণ করছে। এখানে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা ও অন্যান্য সেবাও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. এস. এম. জুলফিকার আলী বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারের নেতৃত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সমাপনী বক্তব্যে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এভিডেন্স ইন ডিজঅ্যাবিলিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মরগন ব্যাংকস বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গবেষণা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও সুপারিশকে বাস্তব নীতি ও কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। তাহলেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়নে গবেষণাভিত্তিক তথ্য ব্যবহার, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদার এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই হতে পারে টেকসই পরিবর্তনের প্রধান ভিত্তি।








