মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ তম স্বাধীনতা দিবস আজ

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কতটা নারীবাদী ছিল?

রুহিনা ফেরদৌস
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কতটা নারীবাদী ছিল?

যুক্তরাষ্ট্র তার স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছে আজ। ঠিক ২৫০ বছর আগে, ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল—

“আমরা এই সত্যগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করি—সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে। স্রষ্টা তাঁদের এমন কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার দিয়েছেন, যা কখনো কেড়ে নেওয়া যায় না। এসব অধিকারের মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখ অন্বেষণের অধিকার।”

—যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ১৭৭৬

কিন্তু ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক—সেই “সব মানুষ”-এর মধ্যে কি নারীরাও ছিলেন?

স্বাধীনতার সূচনালগ্নেই এই প্রশ্নটি জোরালোভাবে তুলেছিলেন একজন নারী—তিনি অ্যাবিগেইল অ্যাডামস।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার কয়েক মাস আগে তিনি তাঁর স্বামী জন অ্যাডামসকে একটি চিঠি লেখেন। জন অ্যাডামস তখন কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা এবং দেশটির দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট (১৭৯৭-১৮০১) হন।

সেই চিঠিতে অ্যাবিগেইল লিখেছিলেন মাত্র কয়েকটি শব্দ—“Remember the Ladies”। বাংলায় যার অর্থ, “নারীদের কথা ভুলে যেও না।”

এটি কেবল একজন স্ত্রীর ব্যক্তিগত অনুরোধ ছিল না; এটি ছিল নতুন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে একটি রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন—

“আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি শুনতে যে তোমরা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছ। আর সেই সঙ্গে, তোমরা যখন নতুন রাষ্ট্রের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করবে, তখন আমি চাই—নারীদের কথা যেন ভুলে যেও না। তোমাদের পূর্বপুরুষদের তুলনায় তাঁদের প্রতি আরও উদার ও ন্যায়সংগত হও। স্বামীদের হাতে এমন সীমাহীন ক্ষমতা দিও না। মনে রেখো, সুযোগ পেলে প্রত্যেক পুরুষই অত্যাচারী হয়ে উঠতে পারে। যদি নারীদের প্রতি যথাযথ যত্ন ও গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তবে আমরাও বিদ্রোহ করতে প্রস্তুত। যেসব আইনে আমাদের কোনো কণ্ঠস্বর নেই, কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, সেসব আইন মানতে আমরা নিজেদের বাধ্য মনে করব না।”

এই চিঠিটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নারীর অধিকার নিয়ে অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের মুহূর্তে অ্যাবিগেইল অ্যাডামস পুরুষ-নেতৃত্বাধীন আইনপ্রণেতাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, স্বাধীনতার আদর্শ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নারীরাও সেই স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অংশীদার হবেন।

আঠারো শতকের সমাজে নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। তাঁরা আইন প্রণয়নে অংশ নিতে পারতেন না। বিবাহের পর তাঁদের সম্পত্তির অধিকার কঠোরভাবে সীমিত হতো। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আইনের চোখে তাঁদের স্বতন্ত্র আইনি পরিচয়ও বিলীন হয়ে যেত।

জন অ্যাডামস তাঁর স্ত্রীর সেদিনের আহ্বানকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করেননি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কিংবা পরবর্তী আইনেও নারীদের সম-অধিকার প্রতিফলিত হয়নি। তবু অ্যাবিগেইলের চিঠি ইতিহাসে টিকে আছে একটি মৌলিক প্রশ্নের জন্য—যদি স্বাধীনতা সত্যিই সবার জন্য হয়, তাহলে নারীরা তার বাইরে থাকবে কেন?

অ্যাবিগেইল স্বাধীনতার ভাষাকেই নারীদের অধিকারের দাবিতে ব্যবহার করার যে বৌদ্ধিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যান্টন সাত দশক পরে সেই ভিত্তিকেই একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রে রূপ দেন।

১৮৪৮ সালে নিউইয়র্কের ছোট্ট শহর সেনেকা ফলসে অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী অধিকার সম্মেলন। এই সম্মেলনের অন্যতম আয়োজক ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারী অধিকার আন্দোলন এবং নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যান্টন। সেখানে তিনি উপস্থাপন করেন “Declaration of Sentiments” নামে একটি ঐতিহাসিক দলিল। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভাষা ও আদর্শকে নারীদের সম-অধিকারের দাবিতে ব্যবহার করায় পরবর্তী সময়ে একে অনেকেই “Declaration of Independence for Women” বা “নারীদের স্বাধীনতার ঘোষণা” বলেও উল্লেখ করেছেন।

স্ট্যান্টন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে পরিচিত বাক্যটিকেই নতুন অর্থে পুনর্লিখন করেন। মূল ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, “all men are created equal”—“সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে।” স্ট্যান্টন সেটিকে পরিবর্তন করে লেখেন, “all men and women are created equal”—“সব নারী ও পুরুষ সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে।”

এই পরিবর্তন ছিল শুধু ভাষাগত নয়; ছিল এক গভীর রাজনৈতিক ঘোষণা। স্ট্যান্টনের যুক্তি ছিল, যদি স্বাধীনতা ও সমতার নীতি একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি হয়, তবে সেই নীতি থেকে নারীদের বাদ দেওয়ার কোনো নৈতিক বা সাংবিধানিক ভিত্তি থাকতে পারে না।

তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের কাঠামো অনুসরণ করে পুরুষতান্ত্রিক মার্কিন সমাজের বিরুদ্ধে ১৮টি অভিযোগ উত্থাপন করেন, যা সংখ্যায় স্বাধীনতার মূল ঘোষণাপত্রে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সমান। এই সমতার নীতির ভিত্তিতে তিনি ১০টি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন, যেখানে নারীদের রাজনৈতিক ও আইনি সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়।

তিনি দেখান, নারীদের ভোটাধিকার নেই; আইন প্রণয়নে তাঁদের কোনো ভূমিকা নেই; বিবাহিত নারীরা সম্পত্তির অধিকার হারান; উচ্চশিক্ষা ও বিভিন্ন পেশায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত; গির্জা ও রাষ্ট্র, উভয় ক্ষেত্রেই তাঁরা অধস্তন অবস্থানে থাকেন। তাঁর মতে, এগুলো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত একটি বৈষম্যমূলক ক্ষমতা-কাঠামোর বহিঃপ্রকাশ।

স্ট্যান্টনের ঘোষণাপত্র শুধু তালিকা তৈরি করেনি; তিনি পরিবর্তনের রূপরেখাও তুলে ধরেছিলেন। সেখানে নারীদের ভোটাধিকার, আইনের সমান সুরক্ষা, সম্পত্তির অধিকার, শিক্ষার সুযোগ, জনজীবনে অংশগ্রহণ এবং ধর্মীয় নেতৃত্বে ভূমিকার দাবি জানানো হয়। সে সময় এসব দাবির অনেকগুলোই অত্যন্ত বিতর্কিত ছিল। বিশেষ করে নারী ভোটাধিকারের প্রস্তাব নিয়ে সম্মেলনের ভেতরেও মতভেদ ছিল। তবু দীর্ঘ বিতর্কের পর প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং সেটিই পরবর্তী নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

সেনেকা ফলস সম্মেলনের ৭২ বছর পর, ১৯২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের উনবিংশ সংশোধনী কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে দেশটির নারীরা সাংবিধানিকভাবে ভোটাধিকার লাভ করেন। তবে স্ট্যান্টনের ঘোষণাপত্রে উত্থাপিত সমান আইনি অধিকার, সমান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সামাজিক মর্যাদার মতো অনেক প্রশ্ন আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচনার বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাসে নারীদের অবদান কেবল অ্যাবিগেইল অ্যাডামস বা এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যান্টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। লেখক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার মার্সি ওটিস ওয়ারেন ছিলেন আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী নারী কণ্ঠ। স্বাধীনতার পর তিনি তিন খণ্ডে History of the Rise, Progress and Termination of the American Revolution গ্রন্থ রচনা করেন, যা আমেরিকান বিপ্লব নিয়ে লেখা প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটি। ইতিহাসবিদেরা তাঁকে প্রায়ই “আমেরিকান বিপ্লবের বিবেক” বলে অভিহিত করেন, যদিও এটি তাঁর আনুষ্ঠানিক উপাধি নয়।

আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কবি ফিলিস হুইটলি তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা ও মানবমর্যাদার প্রশ্ন তুলে ধরেন, যদিও তিনি নিজেই দাসত্বের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন।

এলিজাবেথ ফ্রিম্যান, যিনি ‘মাম বেট’ নামেও পরিচিত, ছিলেন দাসত্বে আবদ্ধ এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী। ম্যাসাচুসেটসের সংবিধানে “সব মানুষ স্বাধীন ও সমান হয়ে জন্মগ্রহণ করে”—এই ঘোষণার ভিত্তিতে তিনি আদালতে নিজের স্বাধীনতার দাবি জানান। ১৭৮১ সালে মামলায় জয়ী হয়ে তিনি শুধু নিজের স্বাধীনতাই অর্জন করেননি; ম্যাসাচুসেটসে দাসপ্রথা বিলুপ্তির পথও সুগম করেছিলেন।

এই নারীদের অবদান মনে করিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ নেতাদের ইতিহাস নয়; এটি সেইসব নারীরও ইতিহাস, যাঁরা কলম, কণ্ঠ, শ্রম, সাহস এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার চেষ্টা করে গেছেন।

তথ্যসূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস, ম্যাসাচুসেটস হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি।