মহরমের মিছিলে বিষভরা ক্যাপসুল বিতরণের চেষ্টা, দুই নারীর উপস্থিত বুদ্ধিতে রক্ষা পেলেন হাজারো মানুষ

ভারতের মুম্বাইয়ের ভায়খলা এলাকায় মহরমের একটি মিছিলে ইঁদুর মারার বিষ মেশানো ক্যাপসুল বিতরণের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দুই নারী স্বেচ্ছাসেবক ইহলাম হামিদি ও রুখসার সৈয়দের উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই মিছিলে সম্ভাব্য বড় ধরনের নাশকতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ২৬ জুন আঞ্জিরবাড়ি এলাকা থেকে রহমতবাগ কবরস্থানের উদ্দেশে মহরমের শোভাযাত্রা বের হয়। ওই মিছিলে ইহলাম হামিদি ও রুখসার সৈয়দ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মাঝগাঁও মসজিদের সামনে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তারা লক্ষ্য করেন, এক ব্যক্তি উপস্থিত মানুষের মধ্যে ক্যাপসুল বিতরণ করছেন এবং দাবি করছেন, এটি সব ধরনের সমস্যার কার্যকর ওষুধ।
পরে ওই ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়। তার নাম ফৈয়াজ নিসার প্রেমজি (৩৯)। তিনি ভারতের পুণের বিমান নগরের বাসিন্দা। তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন দুই নারী। পরে তার কাছ থেকে ১৪ হাজার ৯০০টি ক্যাপসুল জব্দ করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, জব্দ করা ক্যাপসুলে জিঙ্ক ফসফাইড নামে একটি অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক পাওয়া গেছে। নমুনাগুলো পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।
কীভাবে সন্দেহ হলো?
বিবিসি মারাঠিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুখসার সৈয়দ বলেন, মিছিলে অংশ নেওয়া অনেক মানুষ ক্যাপসুলগুলো ‘নিয়াজ-এ-হুসেন’ মনে করে সংগ্রহ করছিলেন। কিন্তু রাত হওয়ায় প্যাকেটের গায়ে কী লেখা ছিল, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না।
তিনি বলেন, ইহলাম একটি ক্যাপসুলের প্যাকেট হাতে নিয়ে দেখেন, সেখানে পরিষ্কারভাবে কিছু লেখা নেই। পরে একটি ক্যাপসুল ভেঙে দেখা হলে ভেতর থেকে কালো রঙের গুঁড়া বের হয়। তারা প্যাকেটের তথ্য অনলাইনে খুঁজেও কোনো তথ্য পাননি। তখনই তাদের সন্দেহ হয়, বিষয়টি বিপজ্জনক হতে পারে।
রুখসার জানান, অভিযুক্ত তখন সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তার হাতে একটি বড় নীল ব্যাগ ছিল, যাতে আরও অনেক ক্যাপসুল ছিল। তার সঙ্গে আরও দুজন ব্যক্তি ছিলেন, যাদের কাছেও একই ধরনের ব্যাগ ছিল।
তিনি বলেন, “আমি তার জামার কলার ধরে ফেলি এবং সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দিই। এরপর মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, যেন কেউ ক্যাপসুল না খান। স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় আমরা বিতরণ করা ক্যাপসুলগুলো সংগ্রহ করে পুলিশের হাতে তুলে দিই।”
ক্যাপসুল ছুড়ে বিতরণ করায় সন্দেহ
ইহলাম হামিদি বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি যেভাবে ক্যাপসুল ছুড়ে ছুড়ে বিতরণ করছিলেন, সেটিই প্রথমে তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়।
তিনি বলেন, “তবররুক বা প্রসাদ এভাবে বিতরণ করা হয় না। একটি ক্যাপসুল আমার পায়ের কাছে এসে পড়ে। সেটি খুলতেই তীব্র এক অচেনা গন্ধ পাই।”
তিনি আরও বলেন, “লোকটি দাবি করছিলেন, মাত্র তিনটি ক্যাপসুলেই সব রোগ ভালো হয়ে যাবে। বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। এরপর আমরা তাকে আটক করি। আমি তার হাত থেকে ব্যাগটি নিয়ে নিই। প্রায় ২০ মিনিট ধরে সবাইকে সতর্ক করি, যেন কেউ ক্যাপসুল না খান।”
তদন্তে যা জানা গেছে
মুম্বাই পুলিশের জোন-১-এর উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) জয়ন্ত মীনা জানান, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৯, ১১০ ও ১২৩ ধারায় মামলা করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, অভিযুক্ত ক্যাপসুলগুলোকে ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিতরণ করছিলেন। তবে একজন ব্যক্তি তা খাওয়ার পরপরই বমি করতে শুরু করেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপরই পুলিশ দ্রুত ক্যাপসুল বিতরণ বন্ধ করে দেয়।
তদন্তে আরও জানা গেছে, অভিযুক্ত প্রায় ৫০ কেজি জিঙ্ক ফসফাইড এবং ৩০ হাজার খালি ক্যাপসুল কিনেছিলেন। গত প্রায় ১৫ দিন ধরে মুম্বাইয়ে অবস্থান করে তিনি ক্যাপসুলগুলোতে বিষাক্ত রাসায়নিক ভরেন। পরিকল্পনা ছিল সেগুলো ব্যথার ওষুধ হিসেবে মানুষের মধ্যে বিতরণ করার।
চারজন অসুস্থ
পুলিশ জানিয়েছে, বিষমিশ্রিত ক্যাপসুল খেয়ে অন্তত চারজন অসুস্থ হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এবং বর্তমানে সবাই শঙ্কামুক্ত।
অসুস্থদের একজন সালমান সৈয়দ জানান, ক্লান্ত লাগায় তিনি একটি ক্যাপসুল খেয়েছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার বমি শুরু হয়। পরে আশপাশের লোকজন তাকে হাবিব হাসপাতালে নিয়ে যান।
আরেক ভুক্তভোগী সৈয়দ আব্বাস বলেন, তাকে বলা হয়েছিল এটি ভিটামিন সি ক্যাপসুল এবং শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এটি খেতে পারবেন। কিন্তু খাওয়ার পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
দুই নারীর প্রশংসায় পুলিশ
মুম্বাই পুলিশ জানিয়েছে, ইহলাম হামিদি ও রুখসার সৈয়দের সতর্কতা এবং দ্রুত পদক্ষেপের কারণেই সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “দুই নারী দ্রুত পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন। তাদের উপস্থিত বুদ্ধির কারণেই অভিযুক্তকে আটক করা সম্ভব হয়েছে এবং বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে।”
২৮ জুন অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা হলে তাকে দুই দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তিনি একাই এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, নাকি এর পেছনে আরও কেউ রয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি মুম্বাইয়ের একটি হোটেলে ওঠেন। তার ডিজিটাল তথ্য, যোগাযোগ এবং উদ্দেশ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য, তদন্ত এখনো চলমান। সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে দেখা হচ্ছে এবং এই ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা








