ভারতে জন্মহার কমতে শুরু করেছে

রোকেয়া কালেকটিভ ডেস্ক
ভারতে জন্মহার কমতে শুরু করেছে
সংগ্রহীত

ভারতের মোট প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা টিএফআর) প্রথমবারের মতো জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে নেমে এসেছে।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন রেজিস্ট্রার জেনারেল ও জনশুমারি কমিশনারের কার্যালয় প্রকাশিত স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসআরএস) স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিপোর্ট ২০২৪-এ এ তথ্য উঠে এসেছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

টিএফআর হলো একজন নারী তার জীবদ্দশায় গড়ে কতজন সন্তানের জন্ম দিতে পারেন, তার একটি পরিমাপ। এই হার এখন এমন পর্যায়ে নেমেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে।

ভারতের জনসংখ্যা কি কমতে শুরু করেছে?

১৯৫০ সালে ভারতের জনসংখ্যা ছিল ৩৬ কোটি। তখন একজন নারী গড়ে ছয়টি সন্তানের জন্ম দিতেন। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১৪৫ কোটি। ২০২৩ সালে ভারত চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশে পরিণত হয় এবং এরপরও জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

তবে সরকারি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভারতের জাতীয় টিএফআর এখন ২.১-এর নিচে নেমে গেছে, যা জনসংখ্যা প্রতিস্থাপনের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রতিস্থাপন স্তর কী?

প্রতিস্থাপন স্তর বলতে বোঝায়, একটি প্রজন্মের জনসংখ্যাকে পরবর্তী প্রজন্মে একই মাত্রায় ধরে রাখতে একজন নারীর গড়ে যত সন্তান থাকা প্রয়োজন। এই হার দীর্ঘ সময় ধরে ২.১-এর নিচে থাকলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে কমে আসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছর ভারতের জনসংখ্যা বাড়তেই থাকবে। তবে টিএফআর যদি আবার ২.১৫-এর ওপরে না ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে জনসংখ্যা হ্রাস অনিবার্য হয়ে উঠবে। বরং জন্মহার আরও কমার সম্ভাবনাই বেশি, যা জনসংখ্যা হ্রাসের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন (আইএইচএমই)-এর গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২১ বছরের মধ্যে ভারতের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর তা দ্রুত কমতে শুরু করবে। শতাব্দীর শেষে ভারতের জনসংখ্যা একশ কোটির কিছু বেশি থাকবে, অর্থাৎ প্রায় ৫০ কোটি মানুষ কমে যেতে পারে।

বিহারে সর্বোচ্চ, দিল্লিতে সর্বনিম্ন জন্মহার

জাতীয় পর্যায়ে জন্মহার কমলেও বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

বিহারে টিএফআর সবচেয়ে বেশি, ২.৯। এরপর রয়েছে উত্তর প্রদেশ (২.৬), মধ্য প্রদেশ (২.৪) এবং রাজস্থান (২.৩)। বড় রাজ্যগুলোর মধ্যে এগুলোই এখনও প্রতিস্থাপন স্তরের ওপরে রয়েছে।

অন্যদিকে, দিল্লিতে টিএফআর মাত্র ১.২, যা ফিনল্যান্ডের ১.৩-এর চেয়েও কম।

দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের অনেক রাজ্যে জন্মহার আরও কম। তামিলনাড়ু, কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গে টিএফআর ১.৩। অন্ধ্র প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাবে এই হার ১.৪। হিমাচল প্রদেশ, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায় টিএফআর ১.৫।

ইলন মাস্কের প্রতিক্রিয়া

প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেন।

তিনি লেখেন, “ভারতের জন্মহার এখন প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে নেমে গেছে। উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার বহু বছর আগেই প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে চলে গিয়েছিল।”

জন্মহার কমার কারণ কী?

১. অভিভাবকদের পরিবর্তিত প্রত্যাশা

বর্তমান সময়ে অনেক ভারতীয় পরিবার কম আয়ের মধ্যেও সন্তানের শিক্ষার পেছনে বেশি বিনিয়োগ করতে চায়। ফলে অনেক পরিবার এক সন্তানেই সীমাবদ্ধ থাকছে, যাতে তাকে ভালো শিক্ষা ও ব্যক্তিগত কোচিংয়ের সুযোগ দেওয়া যায়।

২. যৌথ পরিবারের ভাঙন

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ একক বা নিউক্লিয়ার পরিবারে বসবাস করে। নগরায়ণ ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তনের কারণে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সন্তান লালন-পালনের পুরো দায়িত্ব বাবা-মায়ের ওপর পড়ছে, যা অনেক পরিবারকে কম সন্তান নেওয়ার দিকে উৎসাহিত করছে।

৩. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন

শিক্ষা ও পারিবারিক কাঠামোর পাশাপাশি সামাজিক মনোভাবও জন্মহার কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে ছোট পরিবারকে বেশি আকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করা হচ্ছে। প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রাপ্তির বিস্তার এ পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০-এর দশকে গ্রামাঞ্চলে কেবল টেলিভিশনের প্রসার ঘটার পর গর্ভধারণের হার কমতে শুরু করে। গবেষকেরা মনে করেন, টেলিভিশন নাটকে শহুরে মধ্যবিত্ত নারীদের ছোট পরিবারে সন্তান লালন-পালনের চিত্র দেখানো হওয়ায় মানুষের পারিবারিক ধারণায় পরিবর্তন এসেছে।

ফলে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নগরায়ণ, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন মিলিয়ে ভারতের জন্মহার এখন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনসংখ্যা প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে নেমে এসেছে।