হার না মানা শিল্পী মার্জান সাত্রাপি হার মানলেন শোকের কাছে

(মার্জান সাত্রাপি ছিলেন একাধারে একজন কার্টুনিস্ট, চলচ্চিত্র নির্মাতা, ঔপন্যাসিক ও নারী অধিকারকর্মী। ইরানের শাহদের বিরুদ্ধে বিপ্লবে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন তাঁর পরিবার। খুব দ্রুতই তারা বুঝতে পারেন, বিপ্লব মোল্লাতন্ত্রের কাছে হাতছাড়া হয়েছে। শৈশবেই নির্বাসিত প্রবাস জীবনের কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে। সম্প্রতি তিনি মারা যান।)
১৯৬৯ সালে ইরানের রাশত শহরে জন্ম নেয় একটি মেয়ে। তেহরানের ফরাসি মাধ্যমের স্কুলে পড়া এই মেয়েটি বড় হয় এক অভিজাত, উদারমনা পরিবারে - যে পরিবার মার্ক্সবাদে বিশ্বাস করত, শাহের শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব সব পাল্টে দিল। হঠাৎ করেই তার স্কুলে হিজাব বাধ্যতামূলক হলো, মিশ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেল, পরিচিত মুখেরা কারাগারে গেলেন বা মৃত্যুদণ্ড পেলেন। বিপ্লবের পরপরই শুরু হলো ইরান-ইরাক যুদ্ধ।
মেয়েটির বয়স তখন দশ। সেই দশ বছরের মার্জি - যে ঈশ্বরের সঙ্গে রাতে কথা বলত, যে স্বপ্ন দেখত নবী হবে - তাকে পেরুতে হলো ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম বাঁকগুলো।
চৌদ্দ বছর বয়সে বাবা-মা তাকে পাঠিয়ে দিলেন ভিয়েনায়। বাঁচাতে। সেখানে একাকীত্ব, গৃহহীনতা, নিউমোনিয়া। ফিরলেন তেহরানে। তেহরানে বিশ্ববিদ্যালয়, বিয়ে, বিচ্ছেদ, গভীর বিষণ্নতা, আত্মহত্যার চেষ্টা। তারপর আবার নির্বাসন - এবার স্থায়ী। ১৯৯৪ সালে প্যারিস। সেখানে একোল দে বোজার্টে পড়াশোনা। এবং অবশেষে - কলম নয়, তুলি নয়, গ্রাফিক নভেলের সাদা-কালো রেখায় নিজের জীবনকে আঁকতে শুরু। আর এটাই মার্জান সাত্রাপির গল্প।
পার্সেপোলিস: একটি জীবনের মানচিত্র
২০০০ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত পার্সেপোলিস শুধু একটি গ্রাফিক নভেল নয়। এটি একটি রাজনৈতিক দলিল, একটি মেয়ের বেড়ে ওঠার গল্প, এবং একটি দেশের আত্মার ময়নাতদন্ত। বিপ্লব কীভাবে একটি শিশুর চোখে দেখানো যায়, সেটাই দেখালেন সাত্রাপি। ফরাসি প্রকাশনা সংস্থা ল’অ্যাসোসিয়েশন প্রথম প্রকাশ করে এই বইটি। ২০০৩ সালে ইংরেজি অনুবাদ হওয়ার পরে তা পৌঁছে গেল কোটি পাঠকের কাছে।
এই বইয়ে সাত্রাপি নিজের বিষণ্নতার কথা লুকাননি। ইউরোপে একাকীত্বের পরে, পরিচয়হীনতার যন্ত্রণায় তিনি গভীর অবসাদে পড়েছিলেন। আত্মহত্যার চেষ্টার কথাও এঁকেছেন। কোনো নাটকীয়তা ছাড়া, ক্ষমা না চেয়ে।
পার্সেপোলিসের পরে এলো এমব্রয়ডারিজ (২০০৫)। ইরানি নারীরা চায়ের টেবিলে যৌনতা, বিয়ে, প্রেম আর প্রতারণার গল্প বলছেন - নির্ভয়ে, হাসিমুখে। এই নারীরা ‘আদর্শ’ নন। এরা জটিল, দ্বন্দ্বপ্রবণ, জীবন্ত।
শোককে যিনি ছবিতে আঁকলেন
২০০৬ সালে প্রকাশিত চিকেন উইথ প্লামস আসলে শোকেরই একটি রূপকথা। এই বইয়ে আছেন তাঁর দূরসম্পর্কের আত্মীয় নাসের আলি খানের কথা, ইরানের একজন বিখ্যাত যন্ত্রশিল্পী। প্রিয় বাদ্যযন্ত্র ভেঙে গেলে তিনি শয্যাশায়ী হলেন, আর উঠলেন না। আট দিনে মৃত্যু। একজন প্রেমহারানো, শোকগ্রস্ত মানুষের স্বেচ্ছামৃত্যু।
স্ক্রল.ইনের একটি শোক-বার্তায় কমিক্স প্রকাশক আনন্দ শেনয় মন্তব্য করেছেন: “চিকেন উইথ প্লামস-এর নায়ক নাসের আলি প্রাণ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন যখন জীবনের সেরা ভালোবাসাকে হারালেন। হৃদয়বিদারকভাবে, সাত্রাপির জীবন তাঁর নিজের চরিত্রের আয়না হয়ে গেল।”
এটা কাকতালীয় নয়। সাত্রাপি সারাজীবন এঁকেছেন শোক, যন্ত্রণা, ক্ষতি। কিন্তু কখনো তা লুকানোর পরামর্শ দেননি। শোককে তিনি দিয়েছেন একটি মুখ, একটি শরীর, একটি রাজনৈতিক অবস্থান।
শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ
২০২২ সালে কুর্দি তরুণী মাশা আমিনি ইরানের নৈতিকতা পুলিশের হাতে মারা গেলে সাত্রাপি আবার গ্রাফিক আর্টে ফিরলেন। ২০২৪ সালে প্রকাশিত উওমেন, লাইফ, ফ্রিডম বইটি তিনি বিশেরও বেশি শিল্পী, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীকে নিয়ে তৈরি করলেন। ফার্সি সংস্করণ বিনামূল্যে অনলাইনে উন্মুক্ত করে দিলেন সব ইরানির জন্য। এনআরপি-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সেই সময় তিনি বলেছিলেন: একটি সত্যিকারের নারীবাদী বিপ্লব তখনই সফল হতে পারে যখন পুরুষেরা বুঝবে যে নারীর সমতা তাদের নিজেদের জন্যও ভালো।
একই বছর ২০২৪ সালে প্রিন্সেস অব অ্যাস্টুরিয়াস পুরস্কার পান যোগাযোগ ও মানবিকতা বিভাগে। ২০০৭ সালে পার্সেপোলিসের অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র সংস্করণ কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি পুরস্কার পেয়েছিল। ২০০৮ সালে তিনি হলেন অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে সেরা অ্যানিমেটেড ফিচারের জন্য মনোনীত প্রথম নারী।
শোকে মরা যায়, এটা বিজ্ঞানও বলে
৪ জুন ২০২৬। ফ্রান্স সরকারের বিবৃতি। মার্জান সাত্রাপি আর নেই। বয়স মাত্র ছাপান্ন। কারণ - শোক।
২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল তার স্বামী ম্যাটিয়াস রিপা মারা যান। সুইডিশ অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, একত্রিশ বছরের সঙ্গী। সাত্রাপি তার ইনস্টাগ্রামে একটি একটি করে শব্দ পোস্ট করলেন নয়টি ছবিতে: “For I lost the love of my life।” পুরো পাতাটাই শুধু তাঁর জন্য। এক বছরের একটু বেশি পরে, সাত্রাপি নিজেও চলে গেলেন। পরিবার জানাল - শোকে মৃত্যু।
শোকে মরার কথাটা অনেকেই উড়িয়ে দিতে চান। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। তীব্র শোক কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা তৈরি করতে পারে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটাতে পারে। তাকোৎসুবো সিনড্রোম - যাকে ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ও বলা হয় - তীব্র আবেগজনিত ধাক্কা থেকে হওয়া একটি স্বীকৃত হৃদরোগ। সাত্রাপির মৃত্যুর প্রকৃত মেডিকেল কারণ পরিবার প্রকাশ করেননি। কিন্তু যা বলেছেন তা যথেষ্ট।
শেষ বিবৃতি
পুরুষের শোক আর নারীর শোক - এই দুটোকে সমাজ কখনো সমান চোখে দেখেনি। যে পুরুষ প্রেম হারিয়ে ভেঙে পড়েন তাকে কিংবদন্তি করে তোলা হয়। আর নারী যদি একইভাবে ভেঙে পড়েন, তাকে বলা হয় দুর্বল, আবেগপ্রবণ। তাকে সামলে নিতে বলা হয়।
সাত্রাপি সারাজীবন এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে লিখলেন, আঁকলেন, বললেন। এবং শেষমেশ নিজের ব্যথায় মরলেন, সেটা লুকালেন না। তাঁর পরিবার সেটা লুকাল না।
এটা দুর্বলতা নয়। এটা একটা বক্তব্য।
তাঁর মৃত্যু তাঁর সারাজীবনের সততারই ধারাবাহিকতা। যিনি বলেছেন নারীর অনুভূতিকে গুরুত্ব দাও। লড়লেন না, কারণ কখনো কখনো না-লড়াটাও একটা অধিকার।
সাত্রাপি শিখিয়ে গেছেন: শোক মানে পরাজয় নয়। শোক মানে মানুষ হওয়া। এবং মানুষ হওয়ার অধিকার নারীরও সমান।
তাঁর জন্য শোক করি। তাঁর মতো করেই - সততার সঙ্গে এবং রাজনৈতিকভাবে।








