জানেন তো আপনার অজান্তেই ফেসবুক ইনস্টায় থাকা ছবি ও তথ্য দিয়ে এআই কাজ করছে?

বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহারকারীদের অনুমতি ছাড়াই তাদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–বিষয়ক নানা টুল তৈরি করছে। এতে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি এসব প্রযুক্তি তৈরিতে পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে।
গত ২৮ মে মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বর্তমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় এআই টুল—ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৩, গুগলের জেমিনি, মেটার লামা, ডিপসিক এবং মিডজার্নি ও স্টেবল ডিফিউশন নিয়ে গবেষণা করেছে। এসব গবেষণা নিয়ে ‘আনলফুল বাই ডিজাইন: এক্সপোজিং দ্য হিউম্যান রাইটস কস্টস অব জেনারেটিভ এআই’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন তারা তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে যেসব কোম্পানির এআই মডেল উল্লেখ করা হয়েছে:
ওপেনএআই (জিপিটি-৩ সহ), গুগল (জেমিনি), মেটা (লামা), ডিপসিক, মিডজার্নি এবং স্টেবল ডিফিউশন (ইমেজ জেনারেশন টুল)।
অ্যামনেস্টির মতে, এসব মডেল বিশাল পরিমাণ পাবলিক অনলাইন ডেটা স্ক্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করে তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ডেটা সংগ্রহ আইনসম্মত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এসব প্রযুক্তি কোম্পানি মানুষের অনুমতি ছাড়াই ইন্টারনেট থেকে কোটি কোটি তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করছে (ওয়েব স্ক্র্যাপিং)। এই সংগ্রহ করা তথ্য দিয়ে তারা জেনারেটিভ এআই (যেমন চ্যাটবট বা ছবি তৈরির টুল) তৈরি করছে। সংস্থাটি বলছে, এই প্রযুক্তিগুলো তৈরি হচ্ছে অন্যায়ভাবে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে।
প্রতিবেদনের মূল কেস-ভিত্তিক দাবি অনুযায়ী “আনলফুল ওয়েব স্ক্র্যাপিং” পদ্ধতিতে
ওয়েবসাইট থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেটা সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে থাকে— সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, ছবি, ব্লগ ও আর্টিকেল ও ব্যক্তিগত কনটেন্ট।
অ্যামনেস্টি বলছে, এই প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর সম্মতি ছাড়া হয়, যা ডেটা প্রোটেকশন আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে এবং এটিই এখন এআই সিস্টেমের ডিজাইনের অংশ হয়ে গেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অ্যালগরিদমিক অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাবের প্রধান লিখিতা ব্যানার্জি বলেছেন, কোম্পানিগুলো আধুনিক ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি তৈরির অজুহাতে মানুষের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ছবি এবং ব্যক্তিগত তথ্য তাদের অনুমতি ছাড়াই সংগ্রহ করছে। কোম্পানিগুলোর এই বেআইনি কাজ মানবাধিকারকে বড় ঝুঁকিতে ফেলছে।
মানুষের তথ্য সংগ্রহ করে তৈরি করা এআই সিস্টেমগুলো নিষিদ্ধ করার জন্য অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের সব দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘন হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।
প্রতিবেদনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ডেটা অনলাইনে যেভাবে বিদ্যমান, এআই সেগুলো শিখে নেয়। ফলে বর্ণবাদী বা লিঙ্গবৈষম্যমূলক আউটপুট তৈরি হতে পারে বা স্টেরিওটাইপ আরও শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এছাড়া এসব প্রযুক্তি ইন্টারনেট থেকে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি পোস্ট ও ছবি তাদের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করছে। এতে শুধু মানুষের গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং ইন্টারনেটে থাকা নানা বিদ্বেষমূলক বার্তা, বর্ণবাদ ও লিঙ্গভিত্তিক কুসংস্কারও এসব এআই সিস্টেম শিখে নিচ্ছে। এমনকি নিজেদের উত্তরে সেগুলো আরও বাড়িয়ে দেখাতে পারে।
অ্যামনেস্টি বলছে, এসব এআই টুল মানুষের চিন্তাভাবনার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এগুলো এমনভাবে উত্তর দেয় যা মানুষের নিজস্ব বিশ্বাস ও মতামত বদলে দিতে পারে।
লিখিতা ব্যানার্জি আরও বলেন, অনুমতি ছাড়া এভাবে তথ্য সংগ্রহের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত। সরকারগুলো এখনই ব্যবস্থা নিলে প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিকের পাশাপাশি ইতিবাচক দিকও নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি এসব এআই টুল তৈরির কারণে পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
এআই কোম্পানিগুলো দ্রুত বড় হওয়ায় এসব চালাতে শক্তিশালী চিপ ও বিশাল ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে প্রচুর বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার বাড়ছে। এসব ডেটা সেন্টার নির্মাণের কারণে অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের জমি ও সম্পদ দখলের অভিযোগও উঠছে।
গুগল জানিয়েছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে তাদের কারণে পরিবেশে ক্ষতিকর গ্যাসের নির্গমন ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে মাইক্রোসফটের ক্ষেত্রে ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এ ধরনের নির্গমন ২৯ শতাংশ বেড়েছে। এসব কারণে চিলি, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার মতো খরাপ্রবণ অঞ্চলে স্থানীয়রা ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, যেখানে পানি ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গুগল, ওপেনএআই, মেটা, মাইক্রোসফট, অ্যামাজনসহ বড় কোম্পানিগুলোর কাছে চিঠি পাঠায়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, ইন্টেল, ওপেনএআই ও মেটা এর উত্তর দিয়েছে।
সোর্স: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল








